রাসূল (সা.) ইন্তেকালের পরবর্তী সময়ে খুলাফায়ে রাশেদীনরা ইসলামের প্রচার এবং বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর তারা আরও অনেক অঞ্চল জয় করেন এবং সেখানে ইসলাম প্রচার করেন। ৭৫০ সালের মাঝেই উমাইয়া খিলাফতের নেতৃত্বে ইসলামি সাম্রাজ্য স্পেন ও মরক্কো হতে ভারতবর্ষ ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
এই সময়ের খলিফাগণ মনে করতেন ইসলামি সমাজে জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ হওয়া প্রয়োজন। তারা বিশ্বাস করতেন ইসলামি সমাজ এমন হওয়া উচিত যেখানে বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতি ইসলামের সাথে ও ইসলামের অংশ হিসেবে বিকশিত হবে। তারা মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদী, খৃষ্টান, মুক্ত চিন্তার মানুষ এবং অন্যান্যদেরও বাগদাদ এবং কায়রোর মতো বিখ্যাত শহরগুলোয় অবস্থান করতে দিয়েছেন এবং সেখানে একটি উন্নত সভ্যতার সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তী কয়েকশ বছরব্যাপী উন্নতির শীর্ষে থাকা এই সভ্যতাই খ্রিস্টীয় ইউরোপে মধ্যযুগ হিসেবে পরিচিত।
ইসলামের এই সমস্ত ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলে আমাদেরকে একটি শব্দ-যুগলের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো "ইসলামের স্বর্ণযুগ"। এখন প্রশ্ন হচ্ছে,
১. কোন সময়টাকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়? আর কেনই বা এমনটা বলা হয়ে থাকে?
২. কীভাবে এই স্বর্ণযুগের উত্থান হয়েছিল এবং এই সময়ের প্রধান অর্জনগুলি কী কী ছিল ?
৩. স্বর্ণযুগ কীভাবে শেষ হয়েছিল? অন্য কথায়, ইসলামের ইতিহাসে সেই গৌরবোজ্জ্বল সময়ের পতনের কারণগুলি কী কী ছিল?
আজকে ইসলামের স্বর্ণযুগের উত্থান, সেই সময়কার নানা নিদর্শন এবং পরবর্তীকালীন গৌরবোজ্জ্বল সময়ের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হবে।

ইসলামের স্বর্ণযুগ
ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল সাধারণত ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয় এবং ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যখন মঙ্গোলরা বাগদাদকে ধ্বংস করে। এই সময়ে বাগদাদে বাইতুল হিকমাহ (জ্ঞানের ঘর) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। কিছু ইতিহাসবিদ ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কালকে ১৬ শতক পর্যন্ত প্রসারিত করেন, তবে বেশিরভাগ পণ্ডিত এই সময়সীমাকে অতিক্রান্ত মনে করেন। তারা মনে করেন যে, স্বর্ণযুগের প্রকৃত অবদান এবং প্রভাব ১৫শ শতকের পর থেকে কমতে শুরু করে।। ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল ইউরোপীয় অন্ধকার যুগ (৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর (১৩ থেকে ১৫ শতক) সময়কালের সাথে মিলে যায়, যখন ইউরোপ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি পুনরুদ্ধার করে।
"ইসলামী স্বর্ণযুগ" শব্দগুচ্ছটি ১৯ শতকের "প্রাচ্যবাদী" আন্দোলনের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের আওতায় পশ্চিমা শিক্ষাবিদরা মধ্যপ্রাচ্য, এশীয় এবং উত্তর আফ্রিকার সমাজ অধ্যয়নে নিযুক্ত ছিলেন। তারা ইউরোপীয় সম্প্রসারণের সময় ইসলামী ভূখণ্ডে কাজ করার সময় কিছু অন্তর্নিহিত অনুমান এবং মনোভাব নিয়ে এসেছিলেন, যা উপনিবেশকারীদের প্রচারিত ধারণার সাথে সম্পর্কিত ছিল। এই ধারণাগুলি বিশেষ করে আমেরিকান-আরব পণ্ডিত এডওয়ার্ড সাইদসহ অনেকের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। সাইদের মতে, এই প্রাচ্যবাদী মনোভাবগুলি ইসলামী সমাজের বাস্তবতার সাথে খুব কম সম্পর্কিত ছিল এবং এটি একটি স্টেরিওটাইপ তৈরি করেছে যা ইসলামী সংস্কৃতি ও সমাজের প্রকৃত চিত্রকে বিকৃত করেছে।
ইসলামের স্বর্ণযুগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, পন্ডিত, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, ভূতত্ত্ববিদ, বণিক এবং পর্যটকরা মানবজাতির ইতিহাসে নিজেদের নাম অমর করে রেখেছেন। কবি ও সাহিত্যিকরা সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে সমাজের চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিজ্ঞানীরা নতুন আবিষ্কার ও গবেষণার মাধ্যমে মানবজাতির জ্ঞানকে বিস্তৃত করেছেন। বণিকরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রসারিত করেছেন, যা অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়তা করেছে। দার্শনিকরা নৈতিকতা ও আইনশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছেন, যা সমাজের নৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।
ইসলামের স্বর্ণযুগের উত্থান
ইসলামী স্বর্ণযুগের বিকাশে তিনটি প্রধান রাজবংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই তিনটি রাজবংশের অবদান ছাড়া ইসলামী স্বর্ণযুগের বিকাশ সম্ভব ছিল না।
১. উমাইয়া খিলাফত: (৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ)
.jpg)
উমাইয়া সাম্রাজ্য ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা) এর খিলাফত লাভের মাধ্যমে উমাইয়া পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। তবে মুয়াবিয়া (রা), যিনি দীর্ঘদিন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন, তিনিই উমাইয়া বংশের শাসন সূচনা করেন। রাশিদুন খলিফার শাসনামলে ইসলাম দ্রুত আরব থেকে উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে এবং সময়ের সাথে সাথে দক্ষিণ ইউরোপের আইবেরিয়ান উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 636 খ্রিস্টাব্দে, মুসলিম বাহিনী সিরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এক বছর পরে পারস্যে এসে আধিপত্য বিস্তার করে। সিরিয়া উমাইয়াদের ক্ষমতার ভিত্তি হয়ে উঠে এবং দামেস্ক হয় তাদের রাজধানী। উমাইয়ারা মুসলিমদের বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখে। চার বছর পর, মুসলিম বাহিনী ককেসাস, ট্রান্সঅক্সানিয়া, সিন্ধু, মাগরেব ও ইবেরিয়ান উপদ্বীপ (আন্দালুস) জয় করে মুসলমান বিশ্বের আওতাধীন করে নেয়। সীমার সর্বোচ্চে পৌছালে উমাইয়া খিলাফত মোট ৫.৭৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল (১,৫০,০০,০০০ বর্গ কি.মি.) অঞ্চল অধিকার করে রাখে।তখন পর্যন্ত বিশ্বের দেখা সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ ছিল। অস্তিত্বের সময়কালের দিক থেকে এটি ছিল পঞ্চম।
.jpg)
উমাইয়াদের শাসনের প্রতি অসন্তোষ: উমাইয়া সাম্রাজ্যের শাসনের প্রতি অসন্তোষের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল, যা তাদের শাসনকে দুর্বল করে তুলেছিল। উমাইয়া শাসনকালে আরব এবং অনারব মুসলমানদের মধ্যে বৈষম্য ছিল। অনারব মুসলমানদের প্রতি অবহেলা এবং তাদের অধিকার হ্রাস পাওয়ার কারণে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় নীতির প্রতি অনেক মুসলমানের বিরোধিতা ছিল। তারা ইসলামের মূল নীতিগুলি থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল বলে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান তাদের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। তারা গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচনের পরিবর্তে মনোনয়ন পদ্ধতি চালু করে , অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এই অসন্তোষের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের সূচনা হয়। আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বিরোধের কারণে সিরিয়ার বাইরের প্রদেশগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে দ্বিতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধ (৬৮০-৬৯২) এবং বার্বার বিদ্রোহ (৭৪০-৭৪৩) এর সময়। দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের সময়, উমাইয়া গোত্রের নেতৃত্ব সুফয়ানি শাখা থেকে মারওয়ানি শাখায় হস্তান্তরিত হয়। ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সম্পদ ও লোকবল কমে যায়, যা উমাইয়া খিলাফতের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে আব্বাসীয় বিপ্লব ঘটে, যা উমাইয়া পরিবারকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
আব্বাসীয় বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন আবু মুসলিম, একজন পারস্য সামরিক নেতা। ৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবুল আব্বাস আল-সাফাহকে শিয়া-অধ্যুষিত কুফা শহরে নিয়ে আসেন। আবুল আব্বাস শীঘ্রই নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। দুই বছর পর, আবু মুসলিম ও আস-সাফাহের সেনাবাহিনী টাইগ্রিস নদীর কাছে জাবের যুদ্ধে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে মারওয়ান পরাজিত ও নিহত হন। আস-সাফাহ দামেস্ক দখল করেন এবং আবদ আল-রহমান ব্যতীত উমাইয়া পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের হত্যা করেন। আবদ আল-রহমান স্পেনে পালিয়ে যান এবং সেখানে উমাইয়া সাম্রাজ্য (আন্দালুস) প্রতিষ্ঠা করেন। এই খিলাফত ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে থাকে এবং আন্দালুসের ফিতনার পর এর পতন হয়।
২. আব্বাসীয় রাজবংশ: (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ)
আব্বাসীয় খিলাফত ছিল ইসলামি খিলাফতগুলোর মধ্যে তৃতীয় খিলাফত। এই খিলাফত রাসূল (সা.) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের দ্বারা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে কুফায় প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় মারওয়ানের সময় আব্বাসের চতুর্থ বংশধর ইবরাহিম বিরোধিতা শুরু করেন। খোরাসান প্রদেশ ও শিয়া আরবদের কাছ থেকে সমর্থন লাভের মাধ্যমে তিনি বেশ সাফল্য অর্জন করলেও ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরা পড়েন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কারো মতে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর তার ভাই আবদুল্লাহ প্রতিবাদ এগিয়ে নেন। তিনি আবুল আব্বাস আস সাফাহ নামে পরিচিত হন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উমাইয়াদের জাবের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন।
বিজয়ের পর, তিনি মধ্য এশিয়ায় সেনা পাঠান। তার সেনাবাহিনী ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে ট্যাং রাজবংশের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই যুদ্ধে বন্দী চাইনিজদের কাছ থেকে তারা কাগজ তৈরির পদ্ধতি শিখে নেয়। বারমাকিরা, যারা বাগদাদকে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল, তারা বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম কাগজ কলের প্রচলন ঘটায়। দশ বছরের মধ্য আব্বাসীয়রা স্পেনে উমাইয়া রাজধানী কর্ডোবাতে আরেকটি নামকরা কাগজ কল নির্মাণ করে। এরপর, ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী বাগদাদে স্থানান্তরিত করা হয়।
আব্বাসীয় খেলাফতের সময় খ্রিষ্টান ও হিন্দু পন্ডিতদের অবদান সত্যিই উল্লেখযোগ্য ছিল। এই সময়কালটি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশের একটি সোনালী অধ্যায়। মুসলিম সাম্রাজ্য বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে নতুন নতুন অঞ্চল দখল করে। এই অঞ্চলে স্থানীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা শুরু হয়। বিভিন্ন ভাষার জ্ঞান ধীরে ধীরে আরবি ভাষায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে এই জ্ঞান অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়। সিরিয়াক ও ভারতীয় পন্ডিতরা তাদের দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক কাজগুলো আরবিতে অনুবাদে সাহায্য করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, আল-কিন্দি, যিনি ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতিকে মুসলিম ও খ্রিস্টান বিশ্বে পরিচিত করেন। খ্রিষ্টান ও হিন্দু পন্ডিতদের গবেষণা ও চিন্তাভাবনা মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাজকে সমৃদ্ধ করে। তারা গ্রীক, ভারতীয় এবং সিরিয়াক দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করেছেন। এই সহযোগিতার ফলে মুসলিম সভ্যতা বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে। নিজেদের পরিবার-পরিজন নিয়ে যাতে দুশ্চিন্তা করা না লাগে সেজন্য এসব কাজে নিয়োজিতদের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, স্থাপন করা হয়েছিলো হাউজ অফ উইজডমের মতো লাইব্রেরি, অনুবাদ কেন্দ্র ও একাডেমি। এইভাবে, আব্বাসীয় শাসনামলে একটি নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ ঘটে।
পারস্যে ১৫০ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করার পর, খলিফাকে প্রধান কর্তৃপক্ষ হিসেবে মেনে নিয়ে স্থানীয় আমিরদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। এছাড়াও, খিলাফতটি তার পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ আন্দালুস, মাগরেব ও ইফ্রিকিয়া যথাক্রমে একজন উমাইয়া যুবরাজ, আগলাবি ও ফাতেমীয় খিলাফতের কাছে হারাতে হয়।
মঙ্গোল নেতা হালাকু খান ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদ দখল করার পর আব্বাসীয় খিলাফত বিলুপ্ত হয়। এরপর, তারা মামলুক শাসিত মিশরে অবস্থান করে এবং ১৫১৭ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যাপারে কর্তৃত্ব দাবি করতে থাকে। যদিও রাজনৈতিক ক্ষমতার অভাব ছিল (কায়রোর খলিফা আল-মুস্তাইনের সংক্ষিপ্ত ব্যতিক্রম ছাড়া)
ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯–১১৭১)
ফাতেমীয় খিলাফত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসমাইলি শিয়া খিলাফতীয় রাষ্ট্র, যা ১০ম থেকে ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। ফাতেমীয়রা আরব বংশোদ্ভূত একটি রাজবংশ, যারা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কন্যা ফাতিমা (রা.) এবং তার স্বামী হজরত আলী ইবনে আবি তালিব এর সাথে তাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কিত করে।ফাতেমীয় খিলাফত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসমাইলি শিয়া খিলাফত, যা লোহিত সাগর থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর আফ্রিকার এলাকা শাসন করত। এই খিলাফতটি তিউনিসিয়াকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মিসরকে তাদের রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। তাদের শাসনামলে, খিলাফতটি উন্নতির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায় ও এর অধীনে মাগরেব, সুদান, সিসিলি, লেভান্ট ও হেজাজ শাসিত হয়।
৩. উমাইয়া রাজবংশ (আন্দালুস): (৭৫৬-১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ)
উমাইয়া রাজবংশ (আন্দালুস) ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা ৭৫৬ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই সময়কালে উমাইয়া রাজবংশ আন্দালুসে (বর্তমান স্পেনের একটি অঞ্চল) শাসন করেছিল। এখানে কিছু মূল পয়েন্ট তুলে ধরা হলো:
উমাইয়া খিলাফত: উমাইয়া রাজবংশ ইসলামের দ্বিতীয় খিলাফত হিসেবে পরিচিত। এটি প্রথমে দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে আন্দালুসে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
আন্দালুসের ইতিহাস: ৭১১ সালে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসে প্রবেশ করে এবং ৭৫৬ সালে উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠা ঘটে। এই সময়কালে আন্দালুসে ইসলামী সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও শিল্পের বিকাশ ঘটে।
শাসনকাল: উমাইয়া রাজবংশের শাসনকাল ছিল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সময়। তারা বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করে।
পতন: ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে উমাইয়া রাজবংশের শাসন শেষ হয়, যা স্পেনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
🔆 সমাজ ব্যবস্থা
তৎকালীন ইসলামী সমাজব্যবস্থা ছিল একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক কাঠামো, যা ধর্ম, নৈতিকতা এবং সামাজিক নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এই সমাজব্যবস্থার কিছু মূল বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
স্বাস্থ্যসেবা
এই শতাব্দীতেই সর্বপ্রথম ডাক্তারদের যোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য যোগ্যতার সনদপত্র দেখিয়ে কাজে যোগ দেয়ার প্রচলন শুরু হয়। যা রোগীদের সুরক্ষা এবং চিকিৎসার মান উন্নত করতে সহায়ক ছিল।হাসপাতালগুলো পরিচালনা করতে একটি তিন সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড গঠন করা হতো। নবম শতকে মুসলিম বিশ্বের অনেক শহরেই ওষুধের দোকান চালু হয়ে গিয়েছিলো। শুরুতে অবশ্য তাদের জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম ছিলো না। পরবর্তীতে খলিফা আল মামুন এবং আল মু'তাসিম ফার্মাসিস্টদের জন্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন যা ঔষধের মান এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
.jpg)
ফার্মেসির শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক ছিল। এই প্রশিক্ষণ ফার্মাসিস্টদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের ঔষধ ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর সেবায় দক্ষতা বৃদ্ধি করে। ডাক্তারদের ফার্মেসি খোলার বা ফার্মেসিতে অর্থ বিনিয়োগের অনুমতি না দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এটি নিশ্চিত করেছিল যে ফার্মেসি পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি না ঘটে। ফার্মেসিগুলোর মান নিয়মিতভাবে যাচাই করার জন্য সরকারি পরীক্ষকরা নিয়োজিত ছিলেন। এই প্রক্রিয়া ফার্মেসির মান এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়ক ছিল।
 |
| ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মিশরে প্রতিষ্ঠিত কালাউন হাসপাতাল |
আগে হাসপাতালগুলো রাতের বেলায় বন্ধ হয়ে যেত। দশম শতাব্দী থেকে ২৪ ঘন্টাই সেগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। দরিদ্র কাউকে যাতে অর্থের অভাবে ফিরে যেতে না হয় সেই ব্যাপারটাও নিশ্চিত করা হয়েছিলো, গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা। উদাহরণস্বরুপ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মিশরে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক কালাউন হাসপাতাল যা চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক ছিল। ধনী-গরীব, সবল-দুর্বল, স্থানীয় কিংবা দূর থেকে আগত, চাকুরে-বেকার নির্বিশেষে সবাই সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পেত।
শিক্ষা ব্যবস্থা
 |
| আল-কারাওউইন বিশ্ববিদ্যালয় ৯৭০ |
শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে আল-কারাওউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম যা মরক্কোর ফেজ শহরে ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো এবং ক্রমাগত শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়।এরপর মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৯৭০ (মতান্তরে ৯৭২) খ্রিষ্টাব্দে। এটি প্রথমে একটি মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করে, পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেয়া হয়। ফাতিমীয় খেলাফতের সময় শিক্ষাব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। খলিফারা পণ্ডিতদের বিশেষ সমাদর করতেন, তাদেরকে সভায় গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হতো, শিক্ষার্থীদেরকে জ্ঞানার্জনের জন্য উৎসাহ দেয়া হতো। সেই সাথে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জ্ঞানার্জনের পথ সুগম করতে গড়ে তোলা হয়েছিলো বিভিন্ন লাইব্রেরী। উদাহরণ হিসেবে ত্রিপলির লাইব্রেরী ছিলো একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, যেখানে প্রায় ৩০,০০,০০০ বই ছিল। এটি সত্যিই দুঃখজনক যে ক্রুসেডের সময় এই মূল্যবান সম্পদগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
.jpg)
ত্রিপলির লাইব্রেরী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক লাইব্রেরীগুলোতে যে ধরনের চিন্তা-ভাবনার বিনিময় হতো, তা আজকের পাবলিক লাইব্রেরীর ধারণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই লাইব্রেরীগুলোতে বিভিন্ন পণ্ডিত এবং শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে নতুন নতুন ধারণা এবং জ্ঞান বিনিময় করতেন, যা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া, লাইব্রেরীগুলোতে পণ্ডিতদের জন্য থাকার ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ডিং স্কুলের ব্যবস্থা ছিল, যা শিক্ষার প্রসারে সহায়ক ছিল। এই ধরনের ব্যবস্থা আজকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করে।
শিক্ষার কথা যখন উঠলো, তাহলে পলিম্যাথদের কথা না বললেই নয়। পলিম্যাথ বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তিকে, যিনি বিভিন্ন জ্ঞানের শাখায় দক্ষ এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। স্বর্ণযুগের মুসলিম পলিম্যাথদের মাঝে রয়েছেন - আল-বিরুনী - ইতিহাসবিদ, গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আল-জাহিজ - সাহিত্যিক এবং জীববিজ্ঞানী, যিনি প্রাণীজগতের উপর গবেষণা করেছেন। আল-কিন্দী - দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ, যিনি বিভিন্ন শাস্ত্রে অবদান রেখেছেন। ইবন সিনা (Avicenna) - চিকিৎসা এবং দার্শনিক, যিনি "ক্যানন অফ মেডিসিন" রচনা করেছেন। আল-ইদ্রিসী - ভূগোলবিদ, যিনি মানচিত্র তৈরি করেছেন। ইবন বাজ্জাহ - দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। ইবন জুহ্র - চিকিৎসক এবং দার্শনিক। ইবন তুফাইল - দার্শনিক এবং লেখক। ইবন রুশ্দ (Averroes) - দার্শনিক, যিনি আরিস্টটলের কাজের ব্যাখ্যা করেছেন। আল-সুয়ূতী - ইতিহাসবিদ এবং ইসলামি পণ্ডিত। জাবির ইবন হাইয়ান - রসায়নবিদ, যিনি রসায়নের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। আব্বাস ইবন ফিরনাস - বিজ্ঞানী এবং আবিষ্কারক, যিনি প্রথম বিমান উড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।ইবন আল-হাইথাম (Alhazen) - আলোকবিজ্ঞানী, যিনি দৃষ্টির তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। ইবন আল-নাফিস - চিকিৎসক, যিনি রক্ত সঞ্চালনের তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। ইবন খালদুন - ইতিহাসবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানী, যিনি ইতিহাসের উপর মৌলিক কাজ করেছেন। আল-খারিজ্মী - গণিতজ্ঞ, যিনি অ্যালজেব্রার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। আল-মাসুদী - ইতিহাসবিদ এবং ভ্রমণকারী। আল-মুকাদ্দাসী - ভূগোলবিদ এবং মানচিত্র প্রস্তুতকারী। নাসির আল-দীন আল-তুসী - জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক।
এই পলিম্যাথরা তাদের বিভিন্ন গবেষণা এবং আবিষ্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের কাজ আজও আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে চলেছে।
অর্থনীতি
সেই যুগে ইসলামী সভ্যতার বাণিজ্যিক অবকাঠামো অনেক বিস্তৃত ছিলো এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চোখে পড়ার মতো।আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর এবং ভারতীয় মহাসাগর থেকে চীনা সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো বাণিজ্যিক যোগাযোগ। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য যেমন মসলা, কাপড়, এবং মূল্যবান ধাতু আদান-প্রদান হতো। ইসলামী খিলাফতের সময়ে নৌবাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।সমুদ্রপথে বাণিজ্য করার ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও জ্ঞানের আদান-প্রদান ঘটেছিল। বাগদাদ, কায়রো, এবং কর্ডোবার মতো শহরগুলো বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। এই শহরগুলোতে বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।
কৃষি ব্যবস্থা
এই সময়কালকে ‘আরবের কৃষি বিপ্লব’ বলা হয়, কারণ এটি কৃষির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এবং উন্নতির সূচনা করেছিল। মুসলিম গবেষকরা বিভিন্ন দেশের কৃষি প্রযুক্তি এবং পদ্ধতি গ্রহণ করে সেগুলোকে উন্নত করেছিলেন। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে সেচ ব্যবস্থা, ফসলের ঘূর্ণন এবং নতুন জাতের শস্যের চাষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারত, আফ্রিকা, চীন ইত্যাদি দেশ থেকে খাদ্যশস্য এনে ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শস্য যেমন ধান, গম, ফলমূল এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছিল। ব্যবসায়িক চাহিদার ভিত্তিতে অর্থকরী ফসল যেমন তুলা, আখ এবং মসলা উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে কাজ করা হয়েছিল। এই ফসলগুলো বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হতো, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করেছিল। এই সবকিছু মিলিয়ে ইসলামের স্বর্ণযুগে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
শিল্প, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নতি
এই সময়কালকে মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে বিভিন্ন উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছিল। তখনকার বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় পানি এবং বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগানো শুরু হয়েছিল।
সপ্তম শতাব্দী থেকে জীবাশ্ম জ্বালানীর সীমিত ব্যবহার এবং ওয়াটার মিলের ব্যবহার শুরু হয়। উল্লেখযোগ্য মিলগুলোর মধ্যে ছিল: ফুলিং মিল, গ্রিস্ট মিল, রাইস হালার, শিপ মিল, স্ট্যাম্প মিল, স্টিল মিল, সুগার মিল। মুসলিম প্রকৌশলীরা ক্র্যাঙ্ক শ্যাফট এবং ওয়াটার টার্বাইন উদ্ভাবন করেছিলেন। তারা মিলে গিয়ার লাগানোর ব্যবস্থা এবং পানি উত্তোলনের যান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন।
.jpg)
তখনকার শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদিত কিছু উল্লেখযোগ্য পণ্য যেমন: জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত জিনিসপত্র, সিরামিক দ্রব্যাদি, রাসায়নিক পদার্থ, পাতন প্রযুক্তি, ঘড়ি ও গ্লাস, জলশক্তি ও বায়ুশক্তি চালিত যন্ত্র, কাগজ, মোজাইক, পারফিউম, পেট্রোলিয়াম, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, সিল্ক, চিনি, বস্ত্র, অস্ত্র নির্মাণ ।
শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, সঙ্গীত, এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন শাখায় মুসলিম সমাজ অসাধারণ উন্নতির স্বাক্ষর রেখেছিল। শাসন ব্যবস্থার উন্নতি এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যও এই সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সবকিছু মিলিয়ে, ইসলামের স্বর্ণযুগে প্রযুক্তি এবং শিল্পের উন্নতি মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
স্থাপত্য
মুসলিম স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শনগুলো সত্যিই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই স্থাপনাগুলো শুধুমাত্র ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে না, বরং শিল্প, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে কিছু উল্লেখযোগ্য মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনের তালিকা দেওয়া হলো:
%20%20(3).jpg)
গ্রেট মস্ক অফ কাইরোওয়ান (তিউনিশিয়া)
গ্রেট মস্ক অফ কাইরোওয়ান (আরবি: جامع القيروان الأكبر) তিউনিশিয়ার কাইরোওয়ান শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। মসজিদটি ৬৭০ সালে আরব সেনানায়ক উকবা ইবনে নাফি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। কাইরোওয়ান মসজিদ ইসলামের প্রথম যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি এবং এটি ইসলামের বিস্তারের জন্য একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। মসজিদটির স্থাপত্য শৈলী ইসলামী স্থাপত্যের একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে বিশাল গম্বুজ, সুন্দর মিনার এবং প্রশস্ত প্রাঙ্গণ রয়েছে। কাইরোওয়ান শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং এটি তিউনিশিয়ার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি প্রতি বছর অনেক পর্যটক এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আকর্ষণ করে।
গ্রেট মস্ক অফ সামারা (ইরাক)
 |
| গ্রেট মস্ক অফ সামারা ৮৫১ খ্রিস্টাব্দ |
গ্রেট মস্ক অফ সামারা (আরবি: جامع المتوكلية) ইরাকের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, যা এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম মসজিদ ছিল। এটি ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল দ্বারা নির্মিত হয়। মসজিদটি ইরাকের সামারা শহরে, বাগদাদ থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে, টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত। মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ হল এর ৫২ মিটার লম্বা পেঁচানো মিনার, যা "মালওয়িয়া" নামে পরিচিত। এটি ইসলামী স্থাপত্যের একটি অসাধারণ উদাহরণ, যেখানে ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক উপাদানের মিশ্রণ দেখা যায়। মসজিদটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এবং এটি ইসলামী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রেট মস্ক অফ সামারা আজও পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান, যেখানে ইতিহাস এবং স্থাপত্যের সমন্বয় দেখা যায়।
আল-আজহার মসজিদ (Al-Azhar Mosque)
আল-আজহার মসজিদ (আরবি: الجامع الأزهر) ইসলামী জগতের সবচেয়ে পুরনো এবং বিখ্যাত মসজিদগুলির মধ্যে একটি। ৯৭০ সালে মিশরের কায়রো শহরে মসজিদটি ফাতিমি খলিফা আল-মু'ইজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে প্রার্থনা এবং শিক্ষার স্থান হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি ইসলামী শিক্ষার বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে এবং মিশরে ট্রান্সেপ্টযুক্ত মসজিদের প্রথম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। মসজিদটিতে স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে, যার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী উপাদান এবং ফাতিমি প্রভাব রয়েছে। আল-আজহার তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিখ্যাত, যা বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি। এটি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইন এবং অন্যান্য বিষয় অধ্যয়নের জন্য আকর্ষণ করে। আল-আজহার মসজিদ ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে অব্যাহত রয়েছে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে।
আলহাম্বরা প্যালেস (স্পেন)
আলহাম্বরা প্যালেস (Alhambra) হলো একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ এবং দুর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ কমপ্লেক্স, যা স্পেনের গ্রানাডা শহরে অবস্থিত। এটি ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম বিখ্যাত নিদর্শন এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত প্রাসাদগুলোর মধ্যে একটি।মূলত আলহাম্বরা নির্মিত হয়েছিল ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ সালের মধ্যে, মুসলিম শাসক ইবন আল-আহমার এর শাসনকালে। এটি মুসলিম এবং খ্রিস্টান উভয় সংস্কৃতির প্রভাবকে ধারণ করে। আলহাম্বরা তার অসাধারণ স্থাপত্য, জটিল খোদাই এবং সুন্দর বাগানের জন্য বিখ্যাত। এর মধ্যে রয়েছে নাসরিদ প্রাসাদ, চার্লস প্যালেস, এবং জেনারেলিফে বাগান। আলহাম্বরা প্যালেসের সৌন্দর্য এবং ইতিহাসের জন্য এটি একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটককে আকর্ষণ করে। আল হাকিম মসজিদ (মিসর)
আল হাকিম মসজিদ (Al-Hakim Mosque), যা আল-আনওয়ার নামেও পরিচিত, মিসরের কায়রো শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।মসজিদটির নির্মাণ শুরু হয় ৯৯০ খ্রিস্টাব্দে, খলিফা আল-আজিজ এর সময়। এটি পরে খলিফা আল-হাকিম বি-আমর আল্লাহ এর নামে নামকরণ করা হয়, যিনি ষষ্ঠ ফাতেমীয় খলিফা ছিলেন। মসজিদটি তার বিশাল আকার, জটিল খোদাই এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। এর অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের ডিজাইন দর্শকদের আকর্ষণ করে। মসজিদটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই। আল হাকিম মসজিদ তার ইতিহাস এবং স্থাপত্যের জন্য একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করে। গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান (চীন)
গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান (Great Mosque of Xi'an) চীনের একটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। এটি জিয়ান শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং এটি চীনের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম মসজিদগুলোর মধ্যে একটি। মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ৭৪২ খ্রিস্টাব্দে, যা ইসলামের প্রথম শতাব্দীর সময়কাল। গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান ইসলামী এবং চীনা স্থাপত্যের একটি অনন্য সংমিশ্রণ। এর নির্মাণশৈলী এবং ডিজাইন চীনা ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের প্রভাবকে প্রতিফলিত করে। মসজিদটির মধ্যে রয়েছে সুন্দর বাগান, প্যাভিলিয়ন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা। গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান তার ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের জন্য একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করে। এই স্থাপনাগুলো শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মের এক অনন্য মেলবন্ধন। এগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মুসলিম স্থপতিরা তাদের সময়ে কতটা অসাধারণ কাজ করেছেন।
🔆 স্বর্ণযুগের পরিসমাপ্তি
আস্তে আস্তে একসময় বিবর্ণ হতে শুরু করে মুসলিমদের গৌরবমাখা সেই স্বর্ণযুগ। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের পর শুরু হওয়া ক্রুসেড ক্রমেই অস্থিতিশীল করে তোলে গোটা মুসলিম বিশ্বকে। ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ছিল খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ, যা প্রায় ৩০০ বছর ধরে চলেছিল। এই যুদ্ধগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের কাছ থেকে জেরুসালেম শহর পুনরুদ্ধার করা। প্রথম ক্রুসেডের সফলতার পর, খ্রিষ্টানরা জেরুসালেমে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।
পরবর্তী ক্রুসেডগুলোতে মুসলমানরা ধীরে ধীরে তাদের অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডের ফলে ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে।এটি ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এর অল্প কিছুদিন পরেই তের শতকে ভেতরে ধুঁকতে থাকা মুসলিম বিশ্বের সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক ত্রাস- মঙ্গোলদের আক্রমণ।

১২০৬ সালে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে শক্তিশালী মঙ্গোল সাম্রাজ্য, যা মধ্য এশিয়ায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।১২৫৮ সালের ২৯ জানুয়ারি হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী ও তার মিত্র শক্তিদের সামনে তছনছ হয়ে যায় আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী, তখনকার দিনের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদ। ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেরদিন চলা সেই অভিযানে মঙ্গোল বাহিনীতে ছিলো ১,২০,০০০-১,৫০,০০০ সেনা। অপরপক্ষে আব্বাসীয় খেলাফতের সেনাসংখ্যা ছিলো সেই তুলনায় বেশ কম, ৫০,০০০ প্রায়। যুদ্ধে মুসলিমরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মঙ্গোল বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা না গেলেও সেটা ছিলো খুবই নগণ্য। অন্যদিকে আব্বাসীয়দের পক্ষে থাকা সকল সেনাই সেই অভিযানে নিহত হয়েছিলেন। পাশ্চাত্য সূত্রানুযায়ী সেই যুদ্ধে প্রায় ২,০০,০০০-৮,০০,০০০ সাধারণ নাগরিক মারা গিয়েছিলেন। অপরদিকে আরব বিশ্বের মতে এ সংখ্যাটি ২০,০০,০০০ প্রায়।
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, মঙ্গোলদের এ আক্রমণই ছিলো ইসলামের সোনালী যুগকে ইতিহাসের অধ্যায়ে পরিণত করার মূল নিয়ামক। কালক্রমে একসময় অটোম্যান সাম্রাজ্য উঠে দাঁড়ালেও ইসলামের সোনালী সেই যুগ আর কখনোই ফিরে আসে নি, বরং সোনালী সেই সূর্য কালে কালে অস্তমিতই হয়েছে।