রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র, পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনের সড়ক যেন এক নিমিষেই রূপ নিয়েছিল নির্মম এক হত্যাকাণ্ডের মঞ্চে। ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ (৩৯) যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা হলেন, তাতে প্রশ্ন উঠছে—এই হত্যাকাণ্ড কি কেবলই একটি ব্যক্তিগত শত্রুতার পরিণতি, নাকি এটি বৃহৎ কোন অপরাধ চক্রের অংশ?
ঘটনার পটভূমি ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
গত ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে পাকা রাস্তায় একদল দুর্বৃত্ত সোহাগকে এলোপাতাড়ি মারধর ও কুপিয়ে হত্যা করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলাকারীদের হাতে ছিল ইট, পাথর, রড, ধারালো অস্ত্র—যা থেকে বোঝা যায় হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও অত্যন্ত নিষ্ঠুর।ঘটনার পরপরই কোতয়ালী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের বড় বোন বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার
ডিএমপির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, যৌথবাহিনীর অভিযানে এজাহারভুক্ত আসামি মাহমুদুল হাসান মহিন (৪১) ও তারেক রহমান রবিন (২২) গ্রেফতার হন। রবিনের কাছ থেকে উদ্ধার হয় একটি বিদেশি পিস্তল—যা এই হত্যাকাণ্ডের মাত্রা ও পরিকল্পনার গভীরতা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি, র্যাব আরও দুজনকে গ্রেফতার করে। এ নিয়ে মোট গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়ায় চারজনে।
প্রাথমিক অনুসন্ধান: ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব না গ্যাং কালচার?
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও পূর্ব শত্রুতা। তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, বিষয়টি কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। সোহাগ ছিলেন পুরান ঢাকার ভাঙাড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, যেখানে প্রতিযোগিতা, অবৈধ দখল ও আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বিরোধ চলে আসছে। সোহাগ কি এই ব্যবস্থার কোন বড় খেলোয়াড় ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন কেবলই বড় কারও সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী?
ভিডিও ভাইরাল: সামাজিক আলোড়ন ও প্রশ্ন
এই ঘটনার একটি নির্মম ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর তার মরদেহের ওপরও চলে বর্বরতা। এই ভিডিও জনমনে তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, “এখন রাজধানীর মাঝখানে, হাসপাতালের গেটের সামনে যদি একজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা যায়, তাহলে আমরা নিরাপদ কোথায়?”
আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের কর্তব্য
এই ঘটনার মাধ্যমে উঠে আসে বড় এক প্রশ্ন—রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? প্রকাশ্যে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড, অস্ত্র উদ্ধার, ভিডিও ভাইরাল—সব মিলিয়ে এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দৃষ্টান্তও বলা যেতে পারে। এই মামলার তদন্তে যদি গাফিলতি দেখা যায়, কিংবা মূল হোতারা রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাব খাটিয়ে ছাড়া পেয়ে যায়—তবে এটি ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর নজির তৈরি করবে।
আমার শেষ কথা হলো বিচার না হলে বার্তা যাবে অপরাধীর পক্ষে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। দ্রুত তদন্ত, দোষীদের কঠোর শাস্তি, এবং ব্যবসায়িক ও গ্যাংভিত্তিক অপরাধ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া জরুরি।
লেখক: ডাঃ মনসুর রহমান (গবেষক ও সোশ্যাল এক্টিভিস্ট)

No comments:
Post a Comment