May 03, 2025

ককসিডাইনিয়া (টেলবোনের ব্যথা): লক্ষণ, কারণ এবং চিকিৎসা |

ককসিডাইনিয়া একটি সাধারণ সমস্যা, যা সাধারণত কোমরের নিচের অংশে অনুভূত হয়। এটি বিশেষ করে নারীদের মধ্যে পুরুষদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি দেখা যায়। চলুন, ককসিডাইনিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখে নেওয়া যাক:

মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত স্যাক্রামের (Sacrum) নিচের অংশটি সাধারণত টেল বোন বা ককসিক্স (Coccyx) নামে পরিচিত। এই হাড়টি মানুষের শরীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাইমেটদের (Primates) ক্ষেত্রে, ককসিক্স থেকে লেজ শুরু হয়। তাই, এই হাড়টির নাম 'টেল বোন'। মানুষ-সহ যে সমস্ত প্রাইমেটের লেজ নেই, তাদের ক্ষেত্রে ককসিক্সকে ভেস্টিজিয়াল টেল (Vestigial tail) বা 'অবশিষ্ট লেজ' বলা হয়। ককসিক্স মূলত তিন থেকে পাঁচটি অপূর্ণাঙ্গ কশেরুকা (Vertebrae) নিয়ে গঠিত। এই কশেরুকাগুলি একত্রিত হয়ে একটি ত্রিভুজাকার হাড় তৈরি করে।

ককসিক্সের কাজ:

  • দেহের ওজন সামলানো: স্যাক্রামের সাথে মিলিত হয়ে ককসিক্স বসা, দাঁড়ানো এবং হাঁটাচলার সময় দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • নিয়ন্ত্রণ: চেয়ারে বসা বা পিছন দিকে হেলান দেওয়ার মতো কাজগুলিও ককসিক্সের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।
  • পেশী সংযোগ: ককসিক্স বিভিন্ন পেশী এবং লিগামেন্টের (Ligaments) সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের নড়াচড়ায় সহায়তা করে।

কারণ:

ককসিডাইনিয়ার কিছু সাধারণ কারণ হলো-

আঘাত: পশ্চাদ্দেশের উপর পড়ে গেলে টেলবোনে সবচেয়ে বেশি আঘাত লাগে। মানুষের বসার ভঙ্গি ‘ট্রাইপড’ এর মতো, যেখানে দুটি ইশ্চিয়াল টিউবারসিটি (পেলভিক বোনের অংশ) এবং টেলবোন একত্রে ওজন বহন করে। পড়ে যাওয়ার ফলে এই ‘ট্রাইপড’ এ চাপ পড়ে এবং টেলবোন আঘাতপ্রাপ্ত হয়। টেলবোনের আকার অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ‘সি’-এর মতো। পড়ে যাওয়ার ফলে অনেক সময়েই আরও বেশি বেঁকে যেতে পারে সেটি। অথবা ভেঙে সামনের দিকেও চলে আসতে পারে। 

টেলবোনে আঘাত পেলে বেশ কিছু সমস্যা হতে পারে:

  • আঘাতের ফলে কোমর এবং পশ্চাৎদেশের সংযোগস্থলে তীব্র ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা বসার সময় বাড়ে এবং হাঁটাচলার সময় তীব্র হতে পারে।
  • টেলবোন ভেঙে গেলে বসা তো দূরের কথা, হাঁটাচলাও বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে।
  • আঘাত গুরুতর হলে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা, কোমর শক্ত হয়ে যাওয়া এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রসবকালীন আঘাত: গর্ভাবস্থায় ককসিক্সে চোট পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত নর্মাল ডেলিভারির সময়ে বা ফরসেপ ডেলিভারির সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই টেলবোন ডিসলোকেটেড হয়ে যায়। তখন যথাযথ চিকিৎসা না হলে মোবিলিটি তথা হাঁটা-চলা-বসায় বেশ সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা: দীর্ঘক্ষণ এক ভাবে বসে থাকতে থাকতে ককসিক্সের পেশিগুলিতে ইনফ্ল্যামেশন ঘটে। নিয়মিত চলাফেরার অভাবে ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে পেশি। ফলে শুরু হয় যন্ত্রণা। দেহের ওজন যদি বেশি থাকে তা হলে পেশির চোট তথা ইনফ্ল্যামেশন আরও বাড়তে থাকে। পাশাপাশি, মাত্রাতিরিক্ত ওজনের জন্য চাপ পড়ে স্যাক্রাম ও ককসিক্সে। দুই মিলিয়ে যন্ত্রণা তীব্রতর হয়।

অস্বাস্থ্যকর বসার অভ্যাস: অস্বাস্থ্যকর বসার ভঙ্গি ককসিক্সে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা ককসিডাইনিয়া (টেলবোনের ব্যথা) সহ বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর বসার ভঙ্গিগুলো হলো:
  • কুঁজো হয়ে বসা: যাদের বসার সময় কোমর বাঁকানো থাকে বা ঝুঁকে বসেন, তাদের ক্ষেত্রে ককসিক্সে বেশি চাপ পড়ে। এই ধরনের ভঙ্গিতে মেরুদণ্ড স্বাভাবিক বক্রতা হারায় এবং ককসিক্স ভারসাম্য রক্ষার জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করে, ফলে সেখানে ব্যথা হতে পারে।
  • দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা: একটানা অনেকক্ষণ বসে থাকলে ককসিক্সের উপর চাপ বাড়ে। বিশেষ করে, যাদের বসার কাজ, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
  • অনুচিত চেয়ার ব্যবহার: অনুপযুক্ত চেয়ার, যেমন - শক্ত সিট বা ব্যাক সাপোর্ট নেই এমন চেয়ার ব্যবহার করলে ককসিক্সে চাপ পড়তে পারে।
  • পা ভাঁজ করে বসা: কিছু লোক পা ভাঁজ করে বসে, যা ককসিক্সের উপর চাপ বাড়ায়।
  • সঠিক সাপোর্ট ছাড়া বসা: কোমর বা পিঠের সঠিক সাপোর্ট ছাড়া বসলে মেরুদণ্ড তার স্বাভাবিক বক্রতা বজায় রাখতে পারে না, ফলে ককসিক্সে চাপ পড়ে।

অন্যান্য কারণ: অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে সংক্রমণ, টিউমার, এবং অন্যান্য মেরুদণ্ডের সমস্যা।

ককসিডাইনিয়ার (Coccydynia) প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

  • কোমরের শেষাংশে ব্যথা: এটি ককসিডাইনিয়ার প্রধান লক্ষণ। ব্যথা সাধারণত ককসিক্স অঞ্চলে অনুভূত হয়।
  • ব্যথার ধরন: ব্যথা হালকা থেকে তীব্র হতে পারে এবং এটি সাধারণত বসে থাকার সময় বাড়ে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে বা শক্ত চেয়ারে বসলে ব্যথা বাড়ে।
  • দাঁড়ানো বা হাঁটার সময় ব্যথা: কিছু মানুষের ক্ষেত্রে, দাঁড়ানো বা হাঁটার সময়ও ব্যথা হতে পারে, তবে সাধারণত বসার তুলনায় কম থাকে।
  • স্পর্শকাতরতা: ককসিক্স অঞ্চলে স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভব হতে পারে।
  • পোশাক পরিধানে অসুবিধা: বসার সময় ব্যথা হওয়ার কারণে আঁটসাঁট পোশাক পরতে সমস্যা হতে পারে।
  • অন্যান্য উপসর্গ: কিছু ক্ষেত্রে, কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে, কারণ ব্যথা মলত্যাগে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
  • মানসিক প্রভাব: দীর্ঘমেয়াদী ব্যথার কারণে মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা হতাশা দেখা দিতে পারে।

ককসিডাইনিয়া নির্ণয়ের পদ্ধতি
  • চিকিৎসকের পরামর্শ: প্রথমে একজন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা উচিত। চিকিৎসক আপনার ইতিহাস এবং উপসর্গ সম্পর্কে বিস্তারিত জানবেন।
  • শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক ককসিক্স অঞ্চলে স্পর্শ করে ব্যথার স্থান নির্ধারণ করবেন। এটি ব্যথার তীব্রতা এবং অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে।
  • রেডিওলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন : প্রয়োজনে এক্স-রে বা এমআরআই (MRI) করা হতে পারে। এই পরীক্ষাগুলি ককসিক্সের অবস্থা এবং সম্ভাব্য আঘাত বা সমস্যা চিহ্নিত করতে সহায়ক।
  • অন্য পরীক্ষাগুলি: কিছু ক্ষেত্রে, চিকিৎসক অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারেন যে ব্যথার কারণ ককসিডাইনিয়া কিনা, যেমন: রক্ত পরীক্ষা: সংক্রমণ বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা চিহ্নিত করতে। কোমরের অন্যান্য অংশের পরীক্ষা: যদি ব্যথা অন্য কোনো কারণে হয়।
ককসিডাইনিয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি: ককসিডাইনিয়ার (Coccydynia) চিকিৎসা নির্ভর করে ব্যথার কারণ এবং তীব্রতার উপর। সাধারণত, চিকিৎসার পদ্ধতিগুলি নিম্নলিখিতভাবে বিভক্ত করা যেতে পারে:
  • বিশ্রাম: আঘাতপ্রাপ্ত ককসিক্সকে বিশ্রাম দিন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।
  • ব্যথানাশক ঔষধ: ননস্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস (NSAIDs) যেমন আইবুপ্রোফেন বা ন্যাপ্রোক্সেন ব্যথা এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
  • আইস প্যাক: আঘাতের স্থানটিতে প্রথম ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইস প্যাক ব্যবহার করুন। এটি ফোলা এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে।
  • গরম প্যাক: আইস প্যাক ব্যবহারের পর গরম প্যাক ব্যবহার করা যেতে পারে, যা পেশী শিথিল করতে সাহায্য করে।
  • ফিজিওথেরাপি: ফিজিওথেরাপি পেশী শক্তিশালীকরণ এবং নমনীয়তা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে কোমরের পেশী এবং পিঠের জন্য।
  • সঠিক বসার অভ্যাস: সঠিকভাবে বসার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শক্ত সিটে বসার পরিবর্তে কুশন ব্যবহার করুন।
  • শল্যচিকিৎসা: গুরুতর ক্ষেত্রে, যদি অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকর না হয়, তবে শল্যচিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এটি সাধারণত ককসিক্সের স্থানচ্যুতি বা ভাঙন সংশোধনের জন্য করা হয়।
  • স্টেরয়েড ইনজেকশন: কিছু ক্ষেত্রে, ব্যথা কমানোর জন্য স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়া হতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়
  • সঠিক ভঙ্গি: সোজা হয়ে বসতে হবে, কোমর সামান্য বাঁকানো এবং সিট-এর সাথে পিঠ লেগে থাকা উচিত।
  • নিয়মিত বিরতি: প্রতি আধ ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পর উঠে দাঁড়ানো বা হাঁটাচলা করা উচিত।
  • উপযুক্ত চেয়ার: আরামদায়ক এবং সঠিক সাপোর্ট যুক্ত চেয়ার ব্যবহার করা উচিত।
  • ব্যায়াম: কোমর ও পেটের পেশি শক্তিশালী করার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত।

No comments:

Post a Comment