আর্থ্রাইটিস হলো একটি রোগের গ্রুপ যা শরীরের জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে জয়েন্টগুলোতে ব্যথা, শক্ত হওয়া, এবং ফোলাভাব দেখা দেয়। এটি সাধারণত বয়সের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। ছোট-বড় সব জয়েন্টেই এটি হতে পারে। যেমন: হাতের জয়েন্ট, হাঁটুর জয়েন্ট কিংবা হিপ জয়েন্ট ইত্যাদি। https://youtu.be/NNVrgQxab7Y?si=Qy6-2Czj_oxhqFDB
বিভিন্ন কারণে আর্থ্রাইটিস হতে পারে। যেমন:
- বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জয়েন্ট ও হাঁটুর ক্ষয়: বয়স বাড়ার সাথে সাথে তরুণাস্থি দুর্বল হয়ে যায় এবং এর স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়। ফলে জয়েন্টগুলোতে ঘর্ষণ বাড়ে এবং আর্থ্রাইটিস হতে পারে।
- অতিরিক্ত ওজন: অতিরিক্ত ওজনের কারণে জয়েন্টগুলোতে, বিশেষ করে হাঁটুতে, অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে তরুণাস্থির দ্রুত ক্ষয় হয় এবং আর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- বংশগত প্রবণতা: আর্থ্রাইটিস কিছু ক্ষেত্রে বংশগত হতে পারে। যাদের পরিবারে এই রোগের ইতিহাস আছে, তাদের আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
- আঘাত: জয়েন্টে আঘাত পেলে তরুণাস্থি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পরবর্তীতে আর্থ্রাইটিসের কারণ হতে পারে। খেলাধুলা বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় আঘাত পেলে এই সমস্যা হতে পারে।
- সংক্রমণ: ব্যাকটেরিয়াল বা ভাইরাল ইনফেকশন জয়েন্টগুলোতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা আর্থ্রাইটিসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
- অটোইমিউন রোগ: কিছু অটোইমিউন রোগ, যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জয়েন্টগুলোর উপর আক্রমণ করে এবং আর্থ্রাইটিস সৃষ্টি করে।
আর্থ্রাইটিসের বিভিন্ন প্রকার
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis): এটি সবচেয়ে পরিচিত এবং সাধারণ প্রকারের আর্থ্রাইটিস। সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়। তরুণাস্থির ক্ষয় হওয়ার কারণে এটি হয়, যার ফলে জয়েন্টগুলোতে ব্যথা, ফোলাভাব এবং শক্ত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis): এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জয়েন্টগুলোতে আক্রমণ করে। এর ফলে জয়েন্টগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ হয়, যা ব্যথা, ফোলাভাব এবং জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে।
- গাউটি আর্থ্রাইটিস (Gouty Arthritis): এটি শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়। ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টাল আকারে জয়েন্টগুলোতে জমা হয়, যা তীব্র ব্যথা এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে। সাধারণত পায়ের বুড়ো আঙুলে এটি বেশি দেখা যায়।
- সেপটিক আর্থ্রাইটিস (Septic Arthritis): এটি জয়েন্টগুলোতে ব্যাকটেরিয়াল বা ভাইরাল ইনফেকশনের কারণে হয়। এর ফলে জয়েন্টগুলোতে তীব্র ব্যথা, ফোলাভাব এবং জ্বর হতে পারে। এটি একটি জরুরি অবস্থা এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
- সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস (Psoriatic Arthritis): এটি সোরিয়াসিস (ত্বকের একটি রোগ) রোগীদের মধ্যে দেখা যায়। এতে জয়েন্টগুলোতে ব্যথা, ফোলাভাব এবং ত্বকের সমস্যা একসাথে হতে পারে।
- অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস (Ankylosing Spondylitis): এটি প্রধানত মেরুদণ্ডকে প্রভাবিত করে। এতে মেরুদণ্ডের হাড়গুলো একত্রিত হয়ে শক্ত হয়ে যায়, যার ফলে নড়াচড়ায় অসুবিধা হয়।
- জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস (Juvenile Arthritis): এটি শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে এবং জয়েন্টগুলোতে ব্যথা, ফোলাভাব এবং অন্যান্য উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধ ও খাদ্যাভ্যাস
আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রোগে অস্থিসন্ধি ও হাড়ের ক্ষয় রোধে নিম্নলিখিত খাবার গ্রহণ করা উচিত:
সুস্বাস্থ্যকর খাবার:
- দুধ ও দুধজাত খাবার: ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
- মাছ: ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ, যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। রেড মিটের পরিবর্তে মাছ বেশি খাওয়া উচিত।
- ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার: হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার: এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
- ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
- ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার: প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
- টক জাতীয় ফল: এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ।
- পেস্তা বাদাম, কাঠ বাদাম, শিমের বীজ, সয়াবিন: প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস।
পরিহার করার খাবার:
- রেড মিট: প্রদাহ বাড়াতে পারে।
- বাঁধাকপি, পালং শাক, গাজর, টমেটো, ডাল জাতীয় খাবার: অল্প পরিমাণে খাওয়া উচিত।
- মিষ্টি জাতীয় খাবার: ওজন বৃদ্ধি করে এবং প্রদাহ বাড়াতে পারে।
- কফি: জয়েন্টের ক্ষতি করতে পারে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- ওজন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ওজন জয়েন্টে চাপ বাড়ায়।
- নিয়মিত ব্যায়াম: জয়েন্টের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার: এগুলো আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

No comments:
Post a Comment