December 29, 2024

বিশ্বাস ব্যবস্থার সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি, অযুক্তির যুক্তি।

অন্ধবিশ্বাস কী? 

অন্ধবিশ্বাস হলো এমন একটি বিশ্বাস বা অনুশীলন যা অযৌক্তিক বা অতিপ্রাকৃতিক বলে মনে করা হয়, যা প্রায়শই ভাগ্য বা জাদু দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। এটি সাধারণত অজানার ভয় বা বোঝার অভাব থেকে উদ্ভূত হয়। 

অন্ধবিশ্বাসের কারণ

  • মানুষ যখন কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করতে অসমর্থ হয়, তখন সে অন্ধবিশ্বাসের আশ্রয় গ্রহণ করে। অজ্ঞতা, ভয়, অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ, ঐতিহ্য, ধর্ম, এবং অন্যান্য কারণ অন্ধবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে।
  • অন্ধবিশ্বাস প্রায়শই অনুষ্ঠান বা কর্মের সাথে জড়িত যা ভাগ্যকে প্রভাবিত করতে বা দুর্ভাগ্য প্রতিরোধ করতে বিশ্বাস করা হয়। 

অন্ধবিশ্বাসের সাধারণ উদাহরণ: 

  • কালো বিড়াল: অনেক সংস্কৃতিতে, কালো বিড়ালের সাথে পথ অতিক্রম করা দুর্ভাগ্য বলে মনে করা হয়। 
  • আয়না ভাঙা: এটি প্রায়শই সাত বছরের দুর্ভাগ্য আনতে বলা হয়। শুভ লক্ষণ: খরগোশের পা বা চার পাতার ত্রিপত্রের মতো জিনিসগুলি ভাগ্যবান বলে বিশ্বাস করা হয়।
অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব 

অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। মানুষের মনোবল হ্রাস করে, ভয় বৃদ্ধি করে, সমাজের প্রতি বিশ্বাস হ্রাস করে এই সব প্রভাব অন্ধবিশ্বাস ফেলতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে শুক্রবার শুভ দিন না, তাহলে সে শুক্রবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে ভয় পেতে পারে। এই ভয় তার মনোবল হ্রাস করতে পারে এবং তার জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবার, কোনো মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে কালো বিড়াল দেখলে অমঙ্গল হবে, তাহলে সে কালো বিড়াল দেখলে ভয় পেতে পারে। এই ভয় তার জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং তার সমাজের প্রতি বিশ্বাস হ্রাস করতে পারে।

শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাসের উপর প্রভাব:
অন্ধবিশ্বাস মানুষের শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাসের উপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আসুন, এই প্রভাবগুলোকে বিস্তারিতভাবে দেখি
  • জ্ঞানহীনতা বৃদ্ধি: অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ অনেক সময় বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং যুক্তি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে, তাদের জ্ঞানহীনতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
  • বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রতিবন্ধকতা: অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ বিশ্বাস করে যে কিছু রোগের চিকিৎসা শুধুমাত্র প্রার্থনা বা তাবিজের মাধ্যমে সম্ভব, তাহলে সে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়।
  • সামাজিক চাপ: অনেক সময় সমাজে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাসের কারণে শিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে সংকোচ বোধ করে। এটি তাদের শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে এবং বিজ্ঞানী হতে আগ্রহী তরুণদের উৎসাহ কমিয়ে দেয়।
  • বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির বাধা: অন্ধবিশ্বাসের কারণে সমাজে কিছু কুসংস্কার এবং ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং উদ্ভাবনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অঞ্চলে অন্ধবিশ্বাসের কারণে টিকাদান বা চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা দেখা যায়।
  • মানসিক স্বাস্থ্য: অন্ধবিশ্বাস মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে। যখন মানুষ অযৌক্তিক ভয়ের কারণে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে অগ্রাহ্য করে, তখন তাদের মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ বাড়তে পারে।
সামাজিক জীবনের উপর প্রভাব:
অন্ধবিশ্বাস মানুষের সামাজিক জীবনের উপর বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আসুন, এই প্রভাব গুলো বিস্তারিতভাবে দেখি
  • সামাজিক বিভাজন: অন্ধবিশ্বাসের কারণে সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, গোত্র এবং সামাজিক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষদের প্রতি অবিশ্বাস এবং অনাস্থা পোষণ করে যা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে।
  • কুসংস্কার: অন্ধবিশ্বাস সমাজে কুসংস্কার প্রচার করে যা মানুষের সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অঞ্চলে মানুষ বিশ্বাস করে যে কালো বিড়াল দেখলে অমঙ্গল হবে এবং এই বিশ্বাস মানুষের সামাজিক জীবনে ভয় এবং অনাস্থা সৃষ্টি করে।
  • বৈষম্য: অন্ধবিশ্বাস মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্রের মানুষদের প্রতি অনাস্থা পোষণ করে যা সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
  • সামাজিক উন্নয়নের বাধা: অন্ধবিশ্বাস সমাজের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অঞ্চলে অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সামাজিক সেবা গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে।
  • সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি: অন্ধবিশ্বাস মানুষের মধ্যে বিশ্বাস হ্রাস করে এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে যা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি করে।

অন্ধবিশ্বাস কেন স্থায়ী? 

  • মানসিক সান্ত্বনা: অনেকে, বিশেষ করে অনিশ্চিত সময়ে, অনুষ্ঠানে সান্ত্বনা পান। 
  • সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: অন্ধবিশ্বাস প্রায়শই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসে, একটি সম্প্রদায়ের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

December 26, 2024

কুর্দি জনগণের ভবিষ্যৎ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

 

কুর্দিস্তান অঞ্চলটি আধুনিক তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, ইরান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি প্রায় ৩ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কুর্দি জনগণের সংখ্যা প্রায় পৌনে তিন কোটি। এর মধ্যে তুরস্কে প্রায় ২০%, ইরাকে ১৫%, ইরানে ১০%, এবং সিরিয়ায় ৯% কুর্দি জনগণ বসবাস করে। কুর্দিদের সংস্কৃতি তাদের ভাষা, গান, নৃত্য এবং লোককাহিনীর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাদের নিজস্ব ভাষা, কুর্দি, ইরানি ভাষা পরিবারের একটি অংশ। কুর্দিরা তাদের স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী তুর্কি ও আরবদের থেকে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। তবে তাদের সংস্কৃতিগত মিলের কারণে ইরানিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও রয়েছে। কুর্দিরা কখনোই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি, তবে তারা বিভিন্ন সময় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে। তাদের ইতিহাসে সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর মতো মহান নেতাদের নাম উল্লেখযোগ্য।

কুর্দি জনগোষ্ঠী একটি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক, কিন্তু তারা স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বেশ কিছু জটিল কারণে। আসুন, এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে দেখি:

১. রাজনৈতিক বিভাজন- কুর্দিরা মূলত তুরস্ক, ইরাক, ইরান, এবং সিরিয়া—এই চারটি দেশের মধ্যে বিভক্ত। প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের কারণে কুর্দিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করে আসছে।

২. ইতিহাসের প্রেক্ষাপট- কুর্দি জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯২০ সালের সেভর চুক্তির মাধ্যমে কুর্দিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, পরবর্তীতে লজান চুক্তি দ্বারা তা বাতিল করা হয়। ফলে কুর্দিরা রাষ্ট্রহীন অবস্থায় পড়ে যায়।

৩. সামরিক দমন- কুর্দিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করতে তুরস্ক, ইরাক, ইরান এবং সিরিয়া সরকারগুলো বিভিন্ন সময়ে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্কের সরকার কুর্দি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যা কুর্দিদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করেছে।

৪. অভ্যন্তরীণ বিভাজন- কুর্দি জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনও একটি বড় সমস্যা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধের কারণে তাদের আন্দোলনকে সংগঠিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

৫. আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব- কুর্দিদের স্বাধীনতা আন্দোলন আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট সমর্থন পায়নি। যদিও কিছু দেশ কুর্দিদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

৬. অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ- কুর্দি অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক সময় দুর্বল। এই কারণে তারা নিজেদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহ করতে পারে না।

তুরস্ক কেন কুর্দিদের হুমকি মনে করে?

তুরস্ক এবং কুর্দিদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস সত্যিই জটিল এবং দীর্ঘ। এই সংঘাতের পেছনে অনেকগুলি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। এখানে কিছু মূল কারণ তুলে ধরা হলো:

জাতিগত পরিচয় ও নীতি: তুরস্কের জনসংখ্যার ১৫ থেকে ২০% কুর্দি। কুর্দিদের প্রতি তুরস্কের কর্তৃপক্ষের কঠোর নীতি, বিশেষ করে ১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয়কে অস্বীকার করেছে। কুর্দিদের নাম এবং পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

পিকেকের গঠন: ১৯৭৮ সালে আবদুল্লাহ ওচালান পিকেকে (PKK) গঠন করেন, যার মূল দাবি ছিল তুরস্কের মধ্যে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র গঠন। এর পর থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়, যা আজ পর্যন্ত চলমান। এই সংঘাতের ফলে ৪০,০০০ এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ কুর্দি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে পিকেকে স্বাধীনতার দাবি বাদ দিয়ে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। ২০১৩ সালে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হলেও, ২০১৫ সালে সিরিয়ার সীমান্তে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর পরিস্থিতি আবারও খারাপ হয়ে যায়। তুরস্ক সরকার পিকেকে এবং ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে, যা 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সমন্বিত যুদ্ধ' হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ থেকে তুরস্ক সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সেনা উপস্থিতি অব্যাহত রেখেছে এবং বিভিন্ন শহর দখল করেছে, যা কুর্দি বিদ্রোহীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক সরকার দাবি করে যে, ওয়াইপিজি এবং পিওয়াইডি সাবেক পিকেকে'র সাথে সম্পৃক্ত এবং তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনা করছে।

সিরিয়ার কুর্দিরা কী চায়?

সিরিয়ার কুর্দিরা বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তাদের প্রধান চাওয়া ও দাবি গুলো হলো:

স্ব-শাসন: সিরিয়ার কুর্দিরা নিজেদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল চায়, যেখানে তারা নিজেদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
নিরাপত্তা: কুর্দিরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, বিশেষ করে তুরস্কের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে। তারা নিজেদের সুরক্ষা বাহিনী গঠন করেছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সমর্থন চায়।
রাজনৈতিক স্বীকৃতি: কুর্দিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বীকৃতি দাবি করছে। তারা চায় যে তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন: কুর্দিরা তাদের অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও কাজ করছে, যাতে তারা নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।

বর্তমানে সিরিয়ার কুর্দিরা একটি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যেখানে তারা বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চেষ্টা করছে। তাদের এই চাওয়া ও দাবি বাস্তবায়নের জন্য তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতা খুঁজছে।

ইরাকের কুর্দিরা কি স্বাধীনতা পাবে?

ইরাকের জনসংখ্যার আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ ভাগ কুর্দি। ঐতিহাসিকভাবে, আশেপাশের যে কোনো রাষ্ট্রে বসবাসরত কুর্দিদের চেয়ে বেশি নাগরিক অধিকার এবং সুবিধা ভোগ করেছে তারা। কিন্তু তারা অন্যদের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর অত্যাচারেরও শিকার হয়েছে।

১৯৪৬ সালে ইরাকে স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে লড়াই করার জন্য মুস্তাফা বাজরানি কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (কেডিপি) গঠন করেন। তবে তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে ১৯৬১ সাল থেকে। 

৭০ দশকের শেষদিকে কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে আরবদের পুনর্বাসন শুরু করে সরকার। বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ কিরকুক অঞ্চলের কুর্দিদের সেখান থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় পুনর্বাসন শুরু করা হয়। ৮০ দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এই নীতি আরো বিস্তার লাভ করে, সেসময় কুর্দিরা ইরানকে সমর্থন করে।

১৯৮৮ সালে কুর্দিদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাবশত অভিযান শুরু করেন সাদ্দাম হুসেইন, যার অংশ হিসেবে হালাবজা অঞ্চলে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে যখন ইরাকের পরাজয় হয়, কুর্দি বিদ্রোহীরা তখন বাগদাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ঐ বিদ্রোহ দমনে ইরাকের কর্তৃপক্ষের নেয়া সহিংস পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোট উত্তরে 'নো ফ্লাই জোন' ঘোষণা করে যার ফলে কুর্দিরা সেসব অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। দুই পক্ষের ক্ষমতা ভাগাভাগি সংক্রান্ত একটি চুক্তি করা হলেও ১৯৯৪ সালে ইরাকের কুর্দি দলগুলো চার বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়।

২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যেই আক্রমণে সাদ্দাম হুসেইন ক্ষমতাচ্যুত হন, ঐ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করে কুর্দিরা। তার দু'বছর পর উত্তর ইরাকের তিনটি প্রদেশে কুর্দিস্তান রিজিওনাল গভর্নমেন্ট (কেআরজি) প্রতিষ্ঠা করে সেসব এলাকার জোট সরকারের অংশ হয়।

সেপ্টেম্বর ২০১৭ কুর্দিস্তান অঞ্চলে এবং ২০১৪ সালে কুর্দি মিলিশিয়াদের দখল করা বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর মানুষ একটি গণভোটে অংশ নেয়। সেসময় ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এই গণভোটকে অবৈধ দাবি করে এর বিরোধিতা করে। গণভোটে অংশ নেয়া ৩৩ লাখ মানুষের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। বাগদাদ কর্তৃপক্ষ ঐ গণভোটের ফল নাকচ করার প্রস্তাব করে। পরের মাসে ইরাকের সরকার সমর্থক বাহিনী কুর্দিদের দখলে থাকা বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর দখল নেয়। কিরকুক অঞ্চল এবং সেখানকার তেল থেকে পাওয়া আয় শেষ হয়ে যাওয়ায় কুর্দিদের নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের আশা বড় ধাক্কা খায়।

আইএস'এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুর্দিরা কেন মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল? 

২০১৩ মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক স্টেট গ্রুপ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের তিনটি কুর্দি ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ঐ অঞ্চলে তাদের চালানো একের পর এক হামলা ২০১৪ মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কুর্দি মিলিশিয়া বাহিনীগুলো প্রতিরোধ করতে থাকে। 

জুন ২০১৪ উত্তর ইরাকে আইএস'এর আগ্রাসনের ফলে ইরাকের কুর্দিরাও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইরাকের স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের সরকার এমন অঞ্চলে তাদের পেশমার্গা বাহিনী পাঠায় যেখানে ইরাকের সৈন্যদের অবস্থান ছিল না। আইএস আচমকা আগ্রাসন শুরু করলে বেশ কয়েকটি অঞ্চল থেকে পেশমার্গা বাহিনী সরে আসে। ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘুদের বসবাস ছিল, এমন বেশ কয়েকটি অঞ্চলের পতন হয় - যার মধ্যে একটি হলো সিঞ্জার, যেখানে হাজার হাজার ইয়াজিদিকে আইএস আটক করে রাখে এবং হত্যা করে। ওই আগ্রাসন থামাতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী উত্তর ইরাকে বিমান হামলা চালায় এবং পেশমার্গাদের সাহায্য করতে সামরিক উপদেষ্টা পাঠায়। তিন দশক ধরে তুরস্কে কুর্দি স্বায়ত্বশাসনের লক্ষ্যে লড়াই করা ওয়াইপিজি এবং পিকেকে'ও তাদের সহায়তায় যোগ দেয়। 

সেপ্টেম্বর ২০১৪'তে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের কুর্দি শহর কোবানে'তে হামলা চালায় আইএস, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। তবে ঐ সংঘাত তুরস্কের সীমান্তের অনেক কাছে হলেও তুরস্ক আইএস ঘাঁটিতে হামলা করা বা তুরস্কের কুর্দিদের সীমানা পার করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার অনুমতি দেয়া থেকে বিরত থাকে। 

২০১৫ জানুয়ারিতে এক যুদ্ধের পর কুর্দি বাহিনী কোবানের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করে। ঐ যুদ্ধে অন্তত ১৬০০ মানুষ মারা যায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী, সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস জোট এবং একাধিক আরব মিলিশিয়া বাহিনীকে কুর্দিরা বিভিন্নভাবে সাহায্য করে সিরিয়া থেকে আইএস'কে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করতে। এখন উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় একটি ৩২ কিলোমিটার 'নিরাপদ অঞ্চল' প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের সীমান্ত রক্ষা করতে এবং ২০ লক্ষ সিরিয়ান শরণার্থীকে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে তুরস্ক কুর্দিদের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান শুরু করেছে।