এই পৃথিবী—যেখানে আমরা বেঁচে আছি, বেড়ে উঠি, স্বপ্ন দেখি—তা যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক বিশাল ক্যানভাস।এখানে রয়েছে তুষারে মোড়া বিশাল পর্বতমালা, কখনো আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, কখনো বা পৃথিবীর ভূত্বকে গভীর শক্তির সংঘাতে জন্ম নেয়া এই পাহাড়গুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে নির্ভীকভাবে।
এখানে রয়েছে দিগন্তজোড়া সবুজ সমতল ভূমি,যা চাষাবাদ, নগর গঠন, যোগাযোগ ব্যবস্থা সবকিছুর ভিত্তি । রয়েছে ছুটে চলা হাজারো নদ-নদী, গঙ্গা, যমুনা, আমাজন, নাইল — এরা কৃষির জন্ম দিয়েছে, সমাজ গড়েছে, আবার ইতিহাসের মোড়ও ঘুরিয়েছে। প্রতিটি নদীই যেন একেকটি সভ্যতার সূতিকাগার।
মরুভূমি ধুলো আর তপ্ত বালির রাজত্ব হলেও, এখানেও টিকে থাকার এক কঠিন ও কল্পনাতীত কাহিনি রচিত হয় প্রতিনিয়ত।
পৃথিবীর বৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর। একদিকে বরফাবৃত ভূমি, অন্যদিকে জ্বলন্ত মরুভূমি। কোথাও অরণ্যের সবুজ ছায়া, কোথাও তৃণভূমির অসীম বিস্তার। কোথাও পানির প্রাচুর্য, আবার কোথাও একফোঁটা পানযোগ্য পানি্র জন্য হাহাকার। শুষ্ক পাহাড়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন, বরফাবৃত শিখর—সব মিলেই গড়ে উঠেছে আমাদের এই অনন্য গ্রহ, এই প্রাণের ঠিকানা—পৃথিবী।
আকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে মনে হয়, এ এক জ্যোতির্ময় রত্ন—নীল আর সবুজে ঘেরা এক সুন্দর গ্রহ। এই গ্রহটি আমাদের সৌরজগতের তৃতীয় সদস্য, এবং এ পর্যন্ত জানা একমাত্র স্থান, যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে।
পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘুরে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় তৈরি করে দিন ও রাত। এই অবিরাম ঘূর্ণনেই গড়ে ওঠে আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনের শুরু ও শেষ। আর সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী যখন একবার ঘুরে আসে, সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন। আর তাতেই গড়ে ওঠে আমাদের একটি বছর।
পৃথিবীর অক্ষ ২৩.৫ ডিগ্রি হেলানো বলে আসে ঋতুর রঙিন বৈচিত্র্য কখনো হিমেল শীত, কখনো ঝলমলে গ্রীষ্ম, আর কখনো বর্ষার ঝিরিঝিরি ভালোবাসা।
এই পৃথিবীর সবচেয়ে মহামূল্য সম্পদ হলো এর প্রাণদায়ী বায়ুমণ্ডল। অক্সিজেনে পরিপূর্ণ এই বাতাস আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, প্রতিটি শ্বাসে এনে দেয় জীবন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়...
- এই পৃথিবী কি শুরু থেকেই এত সুন্দর ছিল?
- এর জন্ম কবে এবং কীভাবে হয়েছিল?
- মানবজাতি কি তখনই ছিল? নাকি এসেছিল হাজার হাজার বছর পরে?
- প্রথম কোন জীব পৃথিবীতে এসেছিল?
- আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — জীবনের জন্ম কি এক প্রস্তুত মঞ্চে হয়েছিল, যেখানে বাতাস, পানি, তাপ ও উপাদান সবই অপেক্ষায় ছিল? নাকি জীবন নিজেই ধীরে ধীরে গড়েছে তার চারপাশের পরিবেশ?
এই সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের গহ্বরে...মহাবিশ্বের সেই আদি মুহূর্তে যেখানে কিছুই ছিল না। না আলো, না শব্দ, না সময়, না স্থান। তারপর... এক বিস্ফোরণ। না, কোনো ধ্বংসের নয় বরং এক সৃষ্টি, এক শুভারম্ভ। যাকে আমরা বলি ‘আদি বিস্ফোরণ’ বা Big Bang।
শুরুর সেই মুহূর্তে না ছিল কোনো স্থান, না সময়, না তারা, না গ্যালাক্সি, না পৃথিবী, এমনকি চাঁদের মতো কোনো উপগ্রহও। সবকিছু ছিল সীমাবদ্ধ এক অতিক্ষুদ্র বিন্দুর ভেতরে যা ছিল একটি পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র। কিন্তু হঠাৎ করেই, অজানা এক কারণে, সেই বিন্দুটি প্রসারিত হতে শুরু করল...আর মাত্র কিছু মুহূর্তের মধ্যেই ঘটল ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় ও বিশাল এক বিস্ফোরণ বা Big Bang।
যেখানে আগে কিছুই ছিল না, সেখানে এখন ঘুরে বেড়াতে লাগল হাইড্রোজেন গ্যাসের মেঘ। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল শক্তি ও সম্ভাবনা।
এই বিস্ফোরণের পরপরই ঘটে এক দ্রুতগতির সম্প্রসারণ—যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ইনফ্লেশন। মুহূর্তের মধ্যে মহাবিশ্ব হয়ে উঠল বিশাল ও ভারী। তাপমাত্রা তখন ছিল অত্যন্ত উচ্চ কল্পনার বাইরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রচণ্ড তাপ ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল। আর তখনই, এই বিশাল শক্তির মধ্যে জন্ম নিল এক নতুন শক্তি—মহাকর্ষ, বা গ্র্যাভিটি।
এই গ্র্যাভিটির কারণেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কণাগুলো একত্র হতে লাগল। আর এই একত্রীকরণের মাধ্যমেই গঠিত হলো প্রথম পরমাণু—হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন যখন একত্র হয়ে তার ভর বাড়াতে লাগল,তখন গ্র্যাভিটির প্রভাবে তা রূপ নিতে থাকল হিলিয়াম-এ। আর এই রূপান্তরই ছিল তারাদের জন্মের প্রথম ধাপ।
ধীরে ধীরে, মহাকর্ষের অদৃশ্য টানে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কণাগুলো একে একে টানতে শুরু করে একে অপরকে। এই টানের ফলে গঠিত হয় এক বিশাল গ্যাসীয় মেঘ, যেখানে জড়ো হতে থাকে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম পরমাণু।
এই কেন্দ্রে ক্রমাগত চাপ ও তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, এবং এক সময় শুরু হয় একটি মহাজাগতিক বিপ্লবনিউক্লিয়ার ফিউশন।
হাইড্রোজেন পরমাণু একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ করে তৈরি করতে থাকে হিলিয়াম—এই ফিউশন থেকে জন্ম নেয় প্রবল শক্তি ও আলো। এভাবেই সৃষ্টি হয় প্রথম তারা—এক উজ্জ্বল দীপ্তি, যা ছড়িয়ে দেয় আলো মহাশূন্যের অন্ধকারে।
এইভাবে মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে গঠিত হতে থাকে অগণিত তারা... এই তারাগুলোর ভেতর মহাকর্ষের আকর্ষণে ছোট তারা একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে..তারা একত্রে তৈরি করে এক বিশাল দল, যাকে আমরা বলি আকাশগঙ্গা বা গ্যালাক্সি। এভাবে প্রতিটি গ্যালাক্সি হয়ে ওঠে কোটি কোটি তারার এক মহাজাগতিক পরিবার। যেগুলো একে অপরের চারপাশে ঘুরছে, ছুটে চলছে মহাকর্ষের অনন্ত ছন্দে।
এই গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে একটি হলো মিল্কিওয়ে (Milky Way), যেখানে আমাদের সূর্যের জন্ম হয়। সূর্য ছিল একটি বড় এবং শক্তিশালী গ্র্যাভিটি বিশিষ্ট তারা। এর চারপাশে ঘুরছিল ধুলা, হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম কণাগুলি। এই কণাগুলোর তাপমাত্রা ছিল অনেক বেশি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে।
যখন এই কণাগুলোর তাপমাত্রা কমতে থাকে, তখন গ্র্যাভিটির প্রভাবে তারা একে অপরের কাছাকাছি আসতে থাকে। এই ধূলিকণা ও গ্যাস একত্রে জড়ো হয়ে গঠন করে গ্যাসীয় বৃহৎ বলয় বা মেঘ। এই মেঘগুলো ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়ে পৃথিবীর মতো গ্রহের প্রাথমিক রূপ তৈরি করে। এই ধরণের গ্যাস এবং ধূলিকণার মিশ্রণ একসময় শক্ত পৃষ্ঠ (solid crust) গঠনের দিকে এগোয়।
যদিও তখনও একে আমাদের বর্তমান পৃথিবী বলা যেত না, কারণ এর আকার ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি, এবং এটি সূর্যের চারপাশে ঘূর্ণন করছিল। এই শুরুতে পৃথিবীর অবস্থা ছিল অনেকটা আজকের শুক্র গ্রহের (Venus) মতো, যেখানে টানা বৃষ্টি হতো এবং কোনো স্থিরতা ছিল না। কেউ কল্পনাও করতে পারত না, এই বিক্ষিপ্ত গরম পিণ্ডে ভবিষ্যতে জীবনের জন্ম হতে পারে।
সেই সময় পৃথিবীর তাপমাত্রা এত বেশি ছিল যে পৃষ্ঠের ওপর দিয়ে লাভার নদী প্রবাহিত হতো। তখন পৃথিবীতে অক্সিজেনের অস্তিত্বও ছিল না। প্রচণ্ড তাপ এবং একের পর এক জ্বালামুখী উদ্গিরণ চলছিল।
বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীর এই পর্যায়কে বলা হয় “হেডিয়ান ইরা (Hadean Era)” —এই সময়ে পৃথিবীর কেন্দ্রীয় লাভা ঠান্ডা হতে হতে এক সময় একটি শক্ত পাথুরে স্তর গঠন করে। জ্বালামুখী বিস্ফোরণ ও মহাজাগতিক পিণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে প্রচুর গ্যাস নির্গত হয়, এবং এই গ্যাসগুলো ধীরে ধীরে পৃথিবীর চারপাশে জড়ো হয়ে তৈরি করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল।
অনেকে মনে করেন, যদি এই জ্বালামুখী বিস্ফোরণ এবং মহাজাগতিক সংঘর্ষ না হতো, তবে পৃথিবী অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে যেত। কিন্তু এই বিস্ফোরণ এবং সংঘর্ষই পৃথিবীতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান যোগাতে সাহায্য করে।
এরপর একসময় মহাশূন্য থেকে বরফের বলের মতো মেটেওরাইট (উল্কা) পৃথিবীর বুকে পতিত হতে থাকে। এই মেটেওর গুলি ছিল মূলত বরফে পূর্ণ যখন তারা পৃথিবীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়,তখন তাপমাত্রার কারণে সেই বরফ বাষ্পে পরিণত হয়ে চারপাশে মেঘ তৈরি করে।
এই মেঘগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ করে, তখন শুরু হয় বজ্রসহ মুষলধারে বৃষ্টি। এই বৃষ্টির ফোঁটা পৃথিবীর উত্তপ্ত পৃষ্ঠে পড়তেই বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে ফিরে যেত। এভাবে কোটি কোটি বছর ধরে চলতে থাকে এই বাষ্প → মেঘ → বৃষ্টি চক্র।
এই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর পৃষ্ঠ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকে এবং বিশাল মহাসাগরের জন্ম হয়। প্রতিনিয়ত আকাশে ঝলসে উঠছিল বজ্রবিদ্যুৎ, যার ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের মতো গ্যাসগুলোর সৃষ্টি হতে শুরু করল।
এই নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ার ফলেই বায়ুমণ্ডলে এই গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসগুলোর ঘনত্ব বাড়তে থাকে। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, পৃথিবীতে পানি শুধুমাত্র মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিণ্ড দিয়ে আসেনি—বরং, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত গ্যাসীয় অণুগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন যৌগ সৃষ্টি করতে থাকে।
যখন হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণুর ঘন ঘন সৃষ্টি হতে থাকে, তখন এই দুটি একত্রে মিশে তৈরি করে জলীয় বাষ্প। এই জলীয় বাষ্প একত্রিত হয়ে মেঘে পরিণত হয় এবং এর ফলেই পৃথিবীতে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়। পৃথিবী যেন জলমগ্ন হয়ে পড়ে। তখন মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবী আর কোনো দুর্যোগে পড়বে না— এখন এখানে জীবনের সূচনা হবে।
কিন্তু পৃথিবীর আকার তখনও ছিল অনেক বড়। সমস্যা তখনও শেষ হয়নি। ঠিক এমন সময়, মঙ্গল গ্রহের মতো বিশাল এক গ্রহ পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে এবং এক প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয় — যা পৃথিবীকে আবার ধুলা ও ধোঁয়ার কুয়াশায় পরিণত করে।
এই সংঘর্ষে পৃথিবীর উপরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই গ্রহ (থিয়া) এর উপরের স্তরও নষ্ট হয়ে যায়।পৃথিবী ও থিয়ার এই সংঘর্ষের ফলে প্রচুর ধুলা, গ্যাস ও কণা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যার বেশিরভাগই পৃথিবীর মহাকর্ষে ফিরে আসে, কিন্তু কিছু অংশ পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে।
এই কণাগুলো ধীরে ধীরে জমে একটি শীতল শক্ত পৃষ্ঠ তৈরি করে —এইভাবেই গঠিত হয় আমাদের চন্দ্রমা (মুন)। তখন চাঁদ ছিল পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি, এবং অনেক বড় দেখা যেত প্রায় ২০০ গুণ! তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী-চাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে, আর চাঁদের তলদেশেও শুরু হয় আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও মেটিওরের (উল্কা) বৃষ্টি।
এইসব বিস্ফোরণের ফলে চাঁদের চারপাশে ক্ষণস্থায়ী একটি বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়, কিন্তু চাঁদের মহাকর্ষ শক্তি কম হওয়ায়, এটি ধরে রাখতে পারেনি। ফলে চাঁদে জীবন থাকার সম্ভাবনাও হারিয়ে যায়। উল্কার আঘাতে চাঁদের পৃষ্ঠে যে গর্তগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলোই এখন আমাদের চাঁদের গায়ে দাগ হিসেবে দেখা যায়।
এদিকে, পৃথিবী আবার ঠান্ডা হতে শুরু করে। অগ্ন্যুৎপাত, উল্কাবৃষ্টি এবং বৃষ্টি একসাথে চলতে থাকে, এবং পৃথিবী পুনরায় জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এমনকি সমুদ্রের গভীরেও আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ শুরু হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই আগ্নেয়গিরির কারণেই সমুদ্রের তলায় তৈরি হয় প্রথম অ্যামিনো অ্যাসিড।কিছু বিজ্ঞানীর মতে, হয়তো পৃথিবীতে জীবন শুরু হয়নি বরং তা মঙ্গল গ্রহে শুরু হয়েছিল এবং একটি উল্কার মাধ্যমে সেখান থেকে পৃথিবীতে এসেছে।
একজন বিজ্ঞানী ডেভিড মিলার একটি ল্যাব পরীক্ষায় দেখিয়েছেন যেখানে প্রাচীন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পুনরায় তৈরি করে, বজ্রবিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংমিশ্রণে একটি দ্রব পদার্থ পাওয়া যায় যা ছিল অ্যামিনো অ্যাসিডের সূচনা। এতে প্রমাণ হয়, জীবন রসায়ন থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল।
অন্যদিকে, অনেক বিজ্ঞানীর মতে মঙ্গল ও পৃথিবী দুটোই একই সময়ের অভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। পৃথিবী বড় হওয়ায় এটি বেশি সময় গরম ছিল, আর মঙ্গল আগে ঠান্ডা হয় ফলে হয়তো মঙ্গলে আগেই জীবনের সূচনা হয়েছিল। আর সেই জীবনের অনুপ্রাণিত কণা এক উল্কার মাধ্যমে পৃথিবীতে এসে পড়ে।
যখন এই মেটিওর পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়, তখন পৃথিবীর পরিবেশ ছিল জীবনের জন্য উপযোগী ফলে সেখানে জন্ম নেয় প্রথম কোষ (cell)।
সমুদ্রের গভীরে গঠিত অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেল মেমব্রেন বা কোষের আবরণ তৈরি করে। এর মধ্যেই গঠিত হয় DNA, যা কোষের কেন্দ্রীয় উপাদান। এইভাবেই এককোষী জীব থেকে ধাপে ধাপে তৈরি হয় বহুকোষী জীব।
বিজ্ঞানের ভাষায়, আমরা এবং গাছপালা একই উৎস থেকে উদ্ভূত। যেমন — মানুষের ও কলার DNA প্রায় ৫০% মিল রয়েছে। পৃথিবীর প্রাথমিক সময়কার বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ছিল খুবই কম, বরং মিথেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ছিল বেশি, যার ফলে তখনকার বায়ুমণ্ডল ছিল অম্লীয় (acidic)। এই অম্লীয় বৃষ্টির কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
এই সময়ের পর থেকে মহাবিশ্বের অস্থিরতা কমে যেতে থাকে, উল্কাপাতও অনেক কমে আসে বা বায়ুমণ্ডলের কারণে অনেক আগেই পুড়ে শেষ হয়ে যায়। ফলে পৃথিবী আরও ঠান্ডা হতে থাকে। এবং অবশেষে, আজ থেকে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবীতে "হেম প্রাক্কাল যুগ (Hadean to Archaean transition)" শুরু হয় যেখানে প্রাণধারণের পরিবেশ তৈরি হতে থাকে।
যেদিকেই তাকানো যেত, শুধু বরফ আর বরফ সমগ্র পৃথিবী যেন বরফের মোটা চাদরে ঢাকা। এমনকি যেসব জায়গায় একসময় প্রাণ ছিল, সেখানেও বরফ জমে গিয়েছিল। এই বরফ প্রাণের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক কোটি বছর ধরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা -১৮°C ছিল। ফলে পুরো পৃথিবী একটি বরফের গোলকে পরিণত হয়।
প্রায় ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) বছর আগে যখন পৃথিবীর অনেক অংশ বরফে ঢেকে ছিল, তখন হঠাৎ আগ্নেয়গিরি সক্রিয় হয়ে উঠে। চারদিকে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ শুরু হয় এবং তা থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস বায়ুমণ্ডলে বাড়তে থাকে। এর ফলে সূর্যের আলো আটকে পড়ে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। বরফ গলতে শুরু করে এবং এক সময় সমুদ্র আবারও গঠিত হয়।
এই সময়, বরফের চাদরের নিচে থাকা কোষগুলি ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে বহু-কোষী প্রাণের জন্ম দেয়। সমুদ্রের গভীরে মাছ, ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী, এমনকি ছোট ছোট উদ্ভিদের জন্ম হয়। এই উদ্ভিদ সূর্যের আলো ও বায়ুমণ্ডলের CO₂ ব্যবহার করে ফটোসিন্থেসিস শুরু করে এবং অক্সিজেন নিঃসরণ করে। ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ে।
এভাবে সমুদ্র থেকে স্থলে উদ্ভিদ জন্ম নিতে থাকে এবং কিছু প্রাণী পানির বাইরে আসতে শুরু করে এদের বলা হয় উভচর (amphibians)। এদের মধ্যে জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বিবর্তন ঘটে। প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে এই পরিবর্তনের ফলেই জন্ম নেয় ভয়ঙ্কর ডাইনোসর।
এই সময় বিশাল আকৃতির, মাংসাশী ও তৃণভোজী উভয় ধরনের ডাইনোসর পৃথিবী শাসন করতো। কেউ আকাশে উড়ত, কেউ সমুদ্রে সাঁতার কাটত। তবে বিপদ ছিল ছোট ছোট প্রাণীদের থেকেও বিষাক্ত মশা এতটাই মারাত্মক ছিল যে তারা একটি ডাইনোসরকেও হত্যা করতে পারত।
প্রায় ৬.৫ কোটি বছর আগে, একটি বিশাল উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে আঘাত হানে, যার ফলে ডাইনোসর এবং পৃথিবীর ৭৫% প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর বেঁচে থাকা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে জন্ম হয় প্রাইমেটসদের, যাদের থেকে মানুষের উদ্ভব হয়।
প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন পরিবেশের কারণে তারা বিভিন্ন রূপে বিবর্তিত হয়—গরিলা, চিম্পাঞ্জি ও অবশেষে মানুষে পরিণত হয়। আমাদের শরীরের অনেক অঙ্গ যা একসময় প্রয়োজনীয় ছিল, আজ তা আর কাজ করে না। যেমন—লেজ।
এই পৃথিবীর ইতিহাস, যা বিপদ, রহস্য ও রোমাঞ্চে ভরা—তা থেকেই আমাদের জন্ম হয়েছে। তবুও আমরা আজও এই পৃথিবীর প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি। যদি এখনই আমরা সচেতন না হই, তবে একদিন শুধু আমরাই নয়, পৃথিবীর সব জীবজন্তুই শেষ হয়ে যাবে।