November 24, 2024

ইসলামের স্বর্ণযুগ: ৮ম শতাব্দী থেকে ১৩ শতাব্দী পর্যন্ত।


রাসূল (সা.) ইন্তেকালের পরবর্তী সময়ে খুলাফায়ে রাশেদীনরা ইসলামের প্রচার এবং বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর তারা আরও অনেক অঞ্চল জয় করেন এবং সেখানে ইসলাম প্রচার করেন। ৭৫০ সালের মাঝেই উমাইয়া খিলাফতের নেতৃত্বে ইসলামি সাম্রাজ্য স্পেন ও মরক্কো হতে ভারতবর্ষ ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 

এই সময়ের খলিফাগণ মনে করতেন ইসলামি সমাজে জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ হওয়া প্রয়োজন। তারা বিশ্বাস করতেন ইসলামি সমাজ এমন হওয়া উচিত যেখানে বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতি ইসলামের সাথে ও ইসলামের অংশ হিসেবে বিকশিত হবে। তারা মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদী, খৃষ্টান, মুক্ত চিন্তার মানুষ এবং অন্যান্যদেরও বাগদাদ এবং কায়রোর মতো বিখ্যাত শহরগুলোয় অবস্থান করতে দিয়েছেন এবং সেখানে একটি উন্নত সভ্যতার সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তী কয়েকশ বছরব্যাপী উন্নতির শীর্ষে থাকা এই সভ্যতাই খ্রিস্টীয় ইউরোপে মধ্যযুগ হিসেবে পরিচিত।

ইসলামের এই সমস্ত ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলে আমাদেরকে একটি শব্দ-যুগলের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো "ইসলামের স্বর্ণযুগ"। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, 

১. কোন সময়টাকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়? আর কেনই বা এমনটা বলা হয়ে থাকে? 

২. কীভাবে এই স্বর্ণযুগের উত্থান হয়েছিল এবং এই সময়ের প্রধান অর্জনগুলি কী কী ছিল ? 

৩. স্বর্ণযুগ কীভাবে শেষ হয়েছিল? অন্য কথায়, ইসলামের ইতিহাসে সেই গৌরবোজ্জ্বল সময়ের পতনের কারণগুলি কী কী ছিল?

আজকে ইসলামের স্বর্ণযুগের উত্থান, সেই সময়কার নানা নিদর্শন এবং পরবর্তীকালীন গৌরবোজ্জ্বল সময়ের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হবে। 

ইসলামের স্বর্ণযুগ
ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল সাধারণত ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয় এবং ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যখন মঙ্গোলরা বাগদাদকে ধ্বংস করে। এই সময়ে বাগদাদে বাইতুল হিকমাহ (জ্ঞানের ঘর) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। কিছু ইতিহাসবিদ ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কালকে ১৬ শতক পর্যন্ত প্রসারিত করেন, তবে বেশিরভাগ পণ্ডিত এই সময়সীমাকে অতিক্রান্ত মনে করেন। তারা মনে করেন যে, স্বর্ণযুগের প্রকৃত অবদান এবং প্রভাব ১৫শ শতকের পর থেকে কমতে শুরু করে।। ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল ইউরোপীয় অন্ধকার যুগ (৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর (১৩ থেকে ১৫ শতক) সময়কালের সাথে মিলে যায়, যখন ইউরোপ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি পুনরুদ্ধার করে। 

"ইসলামী স্বর্ণযুগ" শব্দগুচ্ছটি ১৯ শতকের "প্রাচ্যবাদী" আন্দোলনের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের আওতায় পশ্চিমা শিক্ষাবিদরা মধ্যপ্রাচ্য, এশীয় এবং উত্তর আফ্রিকার সমাজ অধ্যয়নে নিযুক্ত ছিলেন। তারা ইউরোপীয় সম্প্রসারণের সময় ইসলামী ভূখণ্ডে কাজ করার সময় কিছু অন্তর্নিহিত অনুমান এবং মনোভাব নিয়ে এসেছিলেন, যা উপনিবেশকারীদের প্রচারিত ধারণার সাথে সম্পর্কিত ছিল। এই ধারণাগুলি বিশেষ করে আমেরিকান-আরব পণ্ডিত এডওয়ার্ড সাইদসহ অনেকের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। সাইদের মতে, এই প্রাচ্যবাদী মনোভাবগুলি ইসলামী সমাজের বাস্তবতার সাথে খুব কম সম্পর্কিত ছিল এবং এটি একটি স্টেরিওটাইপ তৈরি করেছে যা ইসলামী সংস্কৃতি ও সমাজের প্রকৃত চিত্রকে বিকৃত করেছে।

ইসলামের স্বর্ণযুগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, পন্ডিত, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, ভূতত্ত্ববিদ, বণিক এবং পর্যটকরা মানবজাতির ইতিহাসে নিজেদের নাম অমর করে রেখেছেন। কবি ও সাহিত্যিকরা সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে সমাজের চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিজ্ঞানীরা নতুন আবিষ্কার ও গবেষণার মাধ্যমে মানবজাতির জ্ঞানকে বিস্তৃত করেছেন। বণিকরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রসারিত করেছেন, যা অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়তা করেছে। দার্শনিকরা নৈতিকতা ও আইনশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছেন, যা সমাজের নৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।

ইসলামের স্বর্ণযুগের উত্থান

ইসলামী স্বর্ণযুগের বিকাশে তিনটি প্রধান রাজবংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এই তিনটি রাজবংশের অবদান ছাড়া ইসলামী স্বর্ণযুগের বিকাশ সম্ভব ছিল না।

১. উমাইয়া খিলাফত: (৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ)

উমাইয়া সাম্রাজ্য ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা) এর খিলাফত লাভের মাধ্যমে উমাইয়া পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। তবে মুয়াবিয়া (রা), যিনি দীর্ঘদিন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন, তিনিই উমাইয়া বংশের শাসন সূচনা করেন। রাশিদুন খলিফার শাসনামলে  ইসলাম দ্রুত আরব থেকে উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে এবং সময়ের সাথে সাথে দক্ষিণ ইউরোপের আইবেরিয়ান উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 636 খ্রিস্টাব্দে, মুসলিম বাহিনী সিরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এক বছর পরে পারস্যে এসে আধিপত্য বিস্তার করে। সিরিয়া উমাইয়াদের ক্ষমতার ভিত্তি হয়ে উঠে এবং দামেস্ক হয় তাদের রাজধানী। উমাইয়ারা মুসলিমদের বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখে। চার বছর পর, মুসলিম বাহিনী ককেসাস, ট্রান্সঅক্সানিয়া, সিন্ধু, মাগরেব ও ইবেরিয়ান উপদ্বীপ (আন্দালুস) জয় করে মুসলমান বিশ্বের আওতাধীন করে নেয়। সীমার সর্বোচ্চে পৌছালে উমাইয়া খিলাফত মোট ৫.৭৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল (১,৫০,০০,০০০ বর্গ কি.মি.) অঞ্চল অধিকার করে রাখে।তখন পর্যন্ত বিশ্বের দেখা সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ ছিল। অস্তিত্বের সময়কালের দিক থেকে এটি ছিল পঞ্চম।

উমাইয়াদের শাসনের প্রতি অসন্তোষ: উমাইয়া সাম্রাজ্যের শাসনের প্রতি অসন্তোষের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল, যা তাদের শাসনকে দুর্বল করে তুলেছিল।  উমাইয়া শাসনকালে আরব এবং অনারব মুসলমানদের মধ্যে বৈষম্য ছিল। অনারব মুসলমানদের প্রতি অবহেলা এবং তাদের অধিকার হ্রাস পাওয়ার কারণে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় নীতির প্রতি অনেক মুসলমানের বিরোধিতা ছিল। তারা ইসলামের মূল নীতিগুলি থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল বলে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান তাদের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। তারা গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচনের পরিবর্তে মনোনয়ন পদ্ধতি চালু করে , অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এই অসন্তোষের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের সূচনা হয়। 

আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বিরোধের কারণে সিরিয়ার বাইরের প্রদেশগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে দ্বিতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধ (৬৮০-৬৯২) এবং বার্বার বিদ্রোহ (৭৪০-৭৪৩) এর সময়। দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের সময়, উমাইয়া গোত্রের নেতৃত্ব সুফয়ানি শাখা থেকে মারওয়ানি শাখায় হস্তান্তরিত হয়।  ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সম্পদ ও লোকবল কমে যায়, যা উমাইয়া খিলাফতের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে আব্বাসীয় বিপ্লব ঘটে, যা উমাইয়া পরিবারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। 

আব্বাসীয় বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন আবু মুসলিম, একজন পারস্য সামরিক নেতা। ৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবুল আব্বাস আল-সাফাহকে শিয়া-অধ্যুষিত কুফা শহরে নিয়ে আসেন। আবুল আব্বাস শীঘ্রই নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। দুই বছর পর, আবু মুসলিম ও আস-সাফাহের সেনাবাহিনী টাইগ্রিস নদীর কাছে জাবের যুদ্ধে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে মারওয়ান পরাজিত ও নিহত হন। আস-সাফাহ দামেস্ক দখল করেন এবং আবদ আল-রহমান ব্যতীত উমাইয়া পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের হত্যা করেন। আবদ আল-রহমান স্পেনে পালিয়ে যান এবং  সেখানে উমাইয়া সাম্রাজ্য (আন্দালুস) প্রতিষ্ঠা করেন। এ খিলাফত ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে থাকে এবং আন্দালুসের ফিতনার পর এর পতন হয়।

২. আব্বাসীয় রাজবংশ: (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ)

আব্বাসীয় খিলাফত ছিল ইসলামি খিলাফতগুলোর মধ্যে তৃতীয় খিলাফত। এই খিলাফত রাসূল (সা.) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের দ্বারা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে কুফায় প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় মারওয়ানের সময় আব্বাসের চতুর্থ বংশধর ইবরাহিম বিরোধিতা শুরু করেন। খোরাসান প্রদেশ ও শিয়া আরবদের কাছ থেকে সমর্থন লাভের মাধ্যমে তিনি বেশ সাফল্য অর্জন করলেও ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরা পড়েন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কারো মতে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর তার ভাই আবদুল্লাহ প্রতিবাদ এগিয়ে নেন। তিনি আবুল আব্বাস আস সাফাহ নামে পরিচিত হন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উমাইয়াদের জাবের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। 

বিজয়ের পর, তিনি মধ্য এশিয়ায় সেনা পাঠান। তার সেনাবাহিনী ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে ট্যাং রাজবংশের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই যুদ্ধে বন্দী চাইনিজদের কাছ থেকে তারা কাগজ তৈরির পদ্ধতি শিখে নেয়। বারমাকিরা, যারা বাগদাদকে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল, তারা বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম কাগজ কলের প্রচলন ঘটায়। দশ বছরের মধ্য আব্বাসীয়রা স্পেনে উমাইয়া রাজধানী কর্ডোবাতে আরেকটি নামকরা কাগজ কল নির্মাণ করে। এরপর, ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী বাগদাদে স্থানান্তরিত করা হয়। 

আব্বাসীয় খেলাফতের সময় খ্রিষ্টান ও হিন্দু পন্ডিতদের অবদান সত্যিই উল্লেখযোগ্য ছিল। এই সময়কালটি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশের একটি সোনালী অধ্যায়। মুসলিম সাম্রাজ্য বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে নতুন নতুন অঞ্চল দখল করে। এই অঞ্চলে স্থানীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা শুরু হয়। বিভিন্ন ভাষার জ্ঞান ধীরে ধীরে আরবি ভাষায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে এই জ্ঞান অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়। সিরিয়াক ও ভারতীয় পন্ডিতরা তাদের দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক কাজগুলো আরবিতে অনুবাদে সাহায্য করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, আল-কিন্দি, যিনি ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতিকে মুসলিম ও খ্রিস্টান বিশ্বে পরিচিত করেন। খ্রিষ্টান ও হিন্দু পন্ডিতদের গবেষণা ও চিন্তাভাবনা মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাজকে সমৃদ্ধ করে। তারা গ্রীক, ভারতীয় এবং সিরিয়াক দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করেছেন। এই সহযোগিতার ফলে মুসলিম সভ্যতা বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে। নিজেদের পরিবার-পরিজন নিয়ে যাতে দুশ্চিন্তা করা না লাগে সেজন্য এসব কাজে নিয়োজিতদের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, স্থাপন করা হয়েছিলো হাউজ অফ উইজডমের মতো লাইব্রেরি, অনুবাদ কেন্দ্র ও একাডেমি। এইভাবে, আব্বাসীয় শাসনামলে একটি নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ ঘটে। 

পারস্যে ১৫০ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করার পর, খলিফাকে প্রধান কর্তৃপক্ষ হিসেবে মেনে নিয়ে স্থানীয় আমিরদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। এছাড়াও, খিলাফতটি তার পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ আন্দালুস, মাগরেব ও ইফ্রিকিয়া যথাক্রমে একজন উমাইয়া যুবরাজ, আগলাবি ও ফাতেমীয় খিলাফতের কাছে হারাতে হয়।

মঙ্গোল নেতা হালাকু খান ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদ দখল করার পর আব্বাসীয় খিলাফত বিলুপ্ত হয়। এরপর, তারা মামলুক শাসিত মিশরে অবস্থান করে এবং ১৫১৭ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যাপারে কর্তৃত্ব দাবি করতে থাকে। যদিও রাজনৈতিক ক্ষমতার অভাব ছিল (কায়রোর খলিফা আল-মুস্তাইনের সংক্ষিপ্ত ব্যতিক্রম ছাড়া)

ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯–১১৭১)

ফাতেমীয় খিলাফত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসমাইলি শিয়া খিলাফতীয় রাষ্ট্র, যা ১০ম থেকে ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। ফাতেমীয়রা আরব বংশোদ্ভূত একটি রাজবংশ, যারা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কন্যা ফাতিমা (রা.) এবং তার স্বামী হজরত আলী ইবনে আবি তালিব এর সাথে তাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কিত করে।ফাতেমীয় খিলাফত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসমাইলি শিয়া খিলাফত, যা লোহিত সাগর থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর আফ্রিকার এলাকা শাসন করত। এই খিলাফতটি তিউনিসিয়াকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মিসরকে তাদের রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। তাদের শাসনামলে, খিলাফতটি উন্নতির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়  এর অধীনে মাগরেব, সুদান, সিসিলি, লেভান্ট ও হেজাজ শাসিত হয়।

৩. উমাইয়া রাজবংশ (আন্দালুস): (৭৫৬-১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ)

উমাইয়া রাজবংশ (আন্দালুস) ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা ৭৫৬ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই সময়কালে উমাইয়া রাজবংশ আন্দালুসে (বর্তমান স্পেনের একটি অঞ্চল) শাসন করেছিল। এখানে কিছু মূল পয়েন্ট তুলে ধরা হলো:

উমাইয়া খিলাফত: উমাইয়া রাজবংশ ইসলামের দ্বিতীয় খিলাফত হিসেবে পরিচিত। এটি প্রথমে দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে আন্দালুসে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

আন্দালুসের ইতিহাস: ৭১১ সালে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসে প্রবেশ করে এবং ৭৫৬ সালে উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠা ঘটে। এই সময়কালে আন্দালুসে ইসলামী সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও শিল্পের বিকাশ ঘটে।

শাসনকাল: উমাইয়া রাজবংশের শাসনকাল ছিল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সময়। তারা বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করে।

পতন: ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে উমাইয়া রাজবংশের শাসন শেষ হয়, যা স্পেনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।


🔆 সমাজ ব্যবস্থা

তৎকালীন ইসলামী সমাজব্যবস্থা ছিল একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক কাঠামো, যা ধর্ম, নৈতিকতা এবং সামাজিক নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এই সমাজব্যবস্থার কিছু মূল বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:

স্বাস্থ্যসেবা 

এই শতাব্দীতেই সর্বপ্রথম ডাক্তারদের যোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য যোগ্যতার সনদপত্র দেখিয়ে কাজে যোগ দেয়ার প্রচলন শুরু হয়। যা রোগীদের সুরক্ষা এবং চিকিৎসার মান উন্নত করতে সহায়ক ছিলহাসপাতালগুলো পরিচালনা করতে একটি তিন সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড গঠন করা হতো। নবম শতকে মুসলিম বিশ্বের অনেক শহরেই ওষুধের দোকান চালু হয়ে গিয়েছিলো। শুরুতে অবশ্য তাদের জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম ছিলো না। পরবর্তীতে খলিফা আল মামুন এবং আল মু'তাসিম ফার্মাসিস্টদের জন্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন যা ঔষধের মান এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।

ফার্মেসির শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক ছিল। এই প্রশিক্ষণ ফার্মাসিস্টদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের ঔষধ ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর সেবায় দক্ষতা বৃদ্ধি করে। ডাক্তারদের ফার্মেসি খোলার বা ফার্মেসিতে অর্থ বিনিয়োগের অনুমতি না দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এটি নিশ্চিত করেছিল যে ফার্মেসি পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি না ঘটে। ফার্মেসিগুলোর মান নিয়মিতভাবে যাচাই করার জন্য সরকারি পরীক্ষকরা নিয়োজিত ছিলেন। এই প্রক্রিয়া ফার্মেসির মান এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়ক ছিল।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মিশরে প্রতিষ্ঠিত  কালাউন হাসপাতাল
আগে হাসপাতালগুলো রাতের বেলায় বন্ধ হয়ে যেত। দশম শতাব্দী থেকে ২৪ ঘন্টাই সেগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। দরিদ্র কাউকে যাতে অর্থের অভাবে ফিরে যেতে না হয় সেই ব্যাপারটাও নিশ্চিত করা হয়েছিলো, গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা। উদাহরণস্বরুপ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মিশরে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক কালাউন হাসপাতাল যা চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক ছিল। ধনী-গরীব, সবল-দুর্বল, স্থানীয় কিংবা দূর থেকে আগত, চাকুরে-বেকার নির্বিশেষে সবাই সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পেত।

শিক্ষা ব্যবস্থা

আল-কারাওউইন বিশ্ববিদ্যালয় ৯৭০
শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে আল-কারাওউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম যা মরক্কোর ফেজ শহরে ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো এবং ক্রমাগত শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়।এরপর মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৯৭০ (মতান্তরে ৯৭২) খ্রিষ্টাব্দে। এটি প্রথমে একটি মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করে, পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেয়া হয়। ফাতিমীয় খেলাফতের সময় শিক্ষাব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। খলিফারা পণ্ডিতদের বিশেষ সমাদর করতেন, তাদেরকে সভায় গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হতো, শিক্ষার্থীদেরকে জ্ঞানার্জনের জন্য উৎসাহ দেয়া হতো। সেই সাথে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জ্ঞানার্জনের পথ সুগম করতে গড়ে তোলা হয়েছিলো বিভিন্ন লাইব্রেরী। উদাহরণ হিসেবে ত্রিপলির লাইব্রেরী ছিলো একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, যেখানে প্রায় ৩০,০০,০০০ বই ছিল। এটি সত্যিই দুঃখজনক যে ক্রুসেডের সময় এই মূল্যবান সম্পদগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। 
ত্রিপলির লাইব্রেরী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক লাইব্রেরীগুলোতে যে ধরনের চিন্তা-ভাবনার বিনিময় হতো, তা আজকের পাবলিক লাইব্রেরীর ধারণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই লাইব্রেরীগুলোতে বিভিন্ন পণ্ডিত এবং শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে নতুন নতুন ধারণা এবং জ্ঞান বিনিময় করতেন, যা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া, লাইব্রেরীগুলোতে পণ্ডিতদের জন্য থাকার ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ডিং স্কুলের ব্যবস্থা ছিল, যা শিক্ষার প্রসারে সহায়ক ছিল। এই ধরনের ব্যবস্থা আজকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। 
শিক্ষার কথা যখন উঠলো, তাহলে পলিম্যাথদের কথা না বললেই নয়। পলিম্যাথ বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তিকে, যিনি বিভিন্ন জ্ঞানের শাখায় দক্ষ এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। স্বর্ণযুগের মুসলিম পলিম্যাথদের মাঝে রয়েছেন - আল-বিরুনী - ইতিহাসবিদ, গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আল-জাহিজ - সাহিত্যিক এবং জীববিজ্ঞানী, যিনি প্রাণীজগতের উপর গবেষণা করেছেন। আল-কিন্দী - দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ, যিনি বিভিন্ন শাস্ত্রে অবদান রেখেছেন। ইবন সিনা (Avicenna) - চিকিৎসা এবং দার্শনিক, যিনি "ক্যানন অফ মেডিসিন" রচনা করেছেন। আল-ইদ্রিসী - ভূগোলবিদ, যিনি মানচিত্র তৈরি করেছেন। ইবন বাজ্জাহ - দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। ইবন জুহ্‌র - চিকিৎসক এবং দার্শনিক। ইবন তুফাইল - দার্শনিক এবং লেখক। ইবন রুশ্‌দ (Averroes) - দার্শনিক, যিনি আরিস্টটলের কাজের ব্যাখ্যা করেছেন। আল-সুয়ূতী - ইতিহাসবিদ এবং ইসলামি পণ্ডিত। জাবির ইবন হাইয়ান - রসায়নবিদ, যিনি রসায়নের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। আব্বাস ইবন ফিরনাস - বিজ্ঞানী এবং আবিষ্কারক, যিনি প্রথম বিমান উড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।ইবন আল-হাইথাম (Alhazen) - আলোকবিজ্ঞানী, যিনি দৃষ্টির তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। ইবন আল-নাফিস - চিকিৎসক, যিনি রক্ত সঞ্চালনের তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। ইবন খালদুন - ইতিহাসবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানী, যিনি ইতিহাসের উপর মৌলিক কাজ করেছেন। আল-খারিজ্‌মী - গণিতজ্ঞ, যিনি অ্যালজেব্রার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। আল-মাসুদী - ইতিহাসবিদ এবং ভ্রমণকারী। আল-মুকাদ্দাসী - ভূগোলবিদ এবং মানচিত্র প্রস্তুতকারী। নাসির আল-দীন আল-তুসী - জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক।
এই পলিম্যাথরা তাদের বিভিন্ন গবেষণা এবং আবিষ্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের কাজ আজও আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে চলেছে।

অর্থনীতি

সেই যুগে ইসলামী সভ্যতার বাণিজ্যিক অবকাঠামো অনেক বিস্তৃত ছিলো এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চোখে পড়ার মতো।আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর এবং ভারতীয় মহাসাগর থেকে চীনা সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো বাণিজ্যিক যোগাযোগ। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য যেমন মসলা, কাপড়, এবং মূল্যবান ধাতু আদান-প্রদান হতো। ইসলামী খিলাফতের সময়ে নৌবাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।সমুদ্রপথে বাণিজ্য করার ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও জ্ঞানের আদান-প্রদান ঘটেছিল। বাগদাদ, কায়রো, এবং কর্ডোবা মতো শহরগুলো বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। এই শহরগুলোতে বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।

কৃষি ব্যবস্থা 

এই সময়কালকে ‘আরবের কৃষি বিপ্লব’ বলা হয়, কারণ এটি কৃষির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এবং উন্নতির সূচনা করেছিল। মুসলিম গবেষকরা বিভিন্ন দেশের কৃষি প্রযুক্তি এবং পদ্ধতি গ্রহণ করে সেগুলোকে উন্নত করেছিলেন। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে সেচ ব্যবস্থা, ফসলের ঘূর্ণন এবং নতুন জাতের শস্যের চাষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারত, আফ্রিকা, চীন ইত্যাদি দেশ থেকে খাদ্যশস্য এনে ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শস্য যেমন ধান, গম, ফলমূল এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছিল। ব্যবসায়িক চাহিদার ভিত্তিতে অর্থকরী ফসল যেমন তুলা, আখ এবং মসলা উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে কাজ করা হয়েছিল। এই ফসলগুলো বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হতো, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করেছিল। এই সবকিছু মিলিয়ে ইসলামের স্বর্ণযুগে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

শিল্প, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নতি

এই সময়কালকে মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে বিভিন্ন উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছিল তখনকার বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় পানি এবং বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগানো শুরু হয়েছিল। 

সপ্তম শতাব্দী থেকে জীবাশ্ম জ্বালানীর সীমিত ব্যবহার এবং ওয়াটার মিলের ব্যবহার শুরু হয়। উল্লেখযোগ্য মিলগুলোর মধ্যে ছিল: ফুলিং মিল, গ্রিস্ট মিল, রাইস হালার, শিপ মিল, স্ট্যাম্প মিল, স্টিল মিল, সুগার মিল। মুসলিম প্রকৌশলীরা ক্র্যাঙ্ক শ্যাফট এবং ওয়াটার টার্বাইন উদ্ভাবন করেছিলেন। তারা মিলে গিয়ার লাগানোর ব্যবস্থা এবং পানি উত্তোলনের যান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। 

তখনকার শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদিত কিছু উল্লেখযোগ্য পণ্য যেমনজ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত জিনিসপত্র, সিরামিক দ্রব্যাদি, রাসায়নিক পদার্থ, পাতন প্রযুক্তি, ঘড়ি ও গ্লাস, জলশক্তি ও বায়ুশক্তি চালিত যন্ত্র, কাগজ, মোজাইক, পারফিউম, পেট্রোলিয়াম, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, সিল্ক, চিনি, বস্ত্র, অস্ত্র নির্মাণ । 

শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, সঙ্গীত, এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন শাখায় মুসলিম সমাজ অসাধারণ উন্নতির স্বাক্ষর রেখেছিল। শাসন ব্যবস্থার উন্নতি এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যও এই সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সবকিছু মিলিয়ে, ইসলামের স্বর্ণযুগে প্রযুক্তি এবং শিল্পের উন্নতি মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

স্থাপত্য

মুসলিম স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শনগুলো সত্যিই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই স্থাপনাগুলো শুধুমাত্র ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে না, বরং শিল্প, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে কিছু উল্লেখযোগ্য মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনের তালিকা দেওয়া হলো:


গ্রেট মস্ক অফ কাইরোওয়ান (তিউনিশিয়া) 

গ্রেট মস্ক অফ কাইরোওয়ান (আরবি: جامع القيروان الأكبر) তিউনিশিয়ার কাইরোওয়ান শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ।  মসজিদটি ৬৭০ সালে আরব সেনানায়ক  উকবা ইবনে নাফি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। কাইরোওয়ান মসজিদ ইসলামের প্রথম যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি এবং এটি ইসলামের বিস্তারের জন্য একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। মসজিদটির স্থাপত্য শৈলী ইসলামী স্থাপত্যের একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে বিশাল গম্বুজ, সুন্দর মিনার এবং প্রশস্ত প্রাঙ্গণ রয়েছে।  কাইরোওয়ান শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং এটি তিউনিশিয়ার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি প্রতি বছর অনেক পর্যটক এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আকর্ষণ করে।

গ্রেট মস্ক অফ সামারা (ইরাক) 

গ্রেট মস্ক অফ সামারা ৮৫১ খ্রিস্টাব্দ
গ্রেট মস্ক অফ সামারা (আরবি: جامع المتوكلية) ইরাকের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, যা এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম মসজিদ ছিল। এটি ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল দ্বারা নির্মিত হয়। মসজিদটি ইরাকের সামারা শহরে, বাগদাদ থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে, টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত। মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ হল এর ৫২ মিটার লম্বা পেঁচানো মিনার, যা "মালওয়িয়া" নামে পরিচিত। এটি ইসলামী স্থাপত্যের একটি অসাধারণ উদাহরণ, যেখানে ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক উপাদানের মিশ্রণ দেখা যায়। মসজিদটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এবং এটি ইসলামী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রেট মস্ক অফ সামারা আজও পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান, যেখানে ইতিহাস এবং স্থাপত্যের সমন্বয় দেখা যায়

আল-আজহার মসজিদ (Al-Azhar Mosque)

আল-আজহার মসজিদ (আরবি: الجامع الأزهر) ইসলামী জগতের সবচেয়ে পুরনো এবং বিখ্যাত মসজিদগুলির মধ্যে একটি। ৯৭০ সালে মিশরের কায়রো শহরে মসজিদটি ফাতিমি খলিফা আল-মু'ইজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে প্রার্থনা এবং শিক্ষার স্থান হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি ইসলামী শিক্ষার বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে এবং মিশরে ট্রান্সেপ্টযুক্ত মসজিদের প্রথম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। মসজিদটিতে স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে, যার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী উপাদান এবং ফাতিমি প্রভাব রয়েছে। আল-আজহার তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিখ্যাত, যা বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি। এটি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইন এবং অন্যান্য বিষয় অধ্যয়নের জন্য আকর্ষণ করে। আল-আজহার মসজিদ ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে অব্যাহত রয়েছে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে।

আলহাম্বরা প্যালেস (স্পেন)

আলহাম্বরা প্যালেস (Alhambra) হলো একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ এবং দুর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ কমপ্লেক্স, যা স্পেনের গ্রানাডা শহরে অবস্থিত। এটি ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম বিখ্যাত নিদর্শন এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত প্রাসাদগুলোর মধ্যে একটি।মূলত আলহাম্বরা নির্মিত হয়েছিল ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ সালের মধ্যে, মুসলিম শাসক ইবন আল-আহমার এর শাসনকালে। এটি মুসলিম এবং খ্রিস্টান উভয় সংস্কৃতির প্রভাবকে ধারণ করে। আলহাম্বরা তার অসাধারণ স্থাপত্য, জটিল খোদাই এবং সুন্দর বাগানের জন্য বিখ্যাত। এর মধ্যে রয়েছে নাসরিদ প্রাসাদ, চার্লস প্যালেস, এবং জেনারেলিফে বাগান। আলহাম্বরা প্যালেসের সৌন্দর্য এবং ইতিহাসের জন্য এটি একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটককে আকর্ষণ করে। 

আল হাকিম মসজিদ (মিসর)

আল হাকিম মসজিদ (Al-Hakim Mosque), যা আল-আনওয়ার নামেও পরিচিত, মিসরের কায়রো শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।মসজিদটির নির্মাণ শুরু হয় ৯৯০ খ্রিস্টাব্দে, খলিফা আল-আজিজ এর সময়। এটি পরে খলিফা আল-হাকিম বি-আমর আল্লাহ এর নামে নামকরণ করা হয়, যিনি ষষ্ঠ ফাতেমীয় খলিফা ছিলেন। মসজিদটি তার বিশাল আকার, জটিল খোদাই এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। এর অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের ডিজাইন দর্শকদের আকর্ষণ করে। মসজিদটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই। আল হাকিম মসজিদ তার ইতিহাস এবং স্থাপত্যের জন্য একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করে। 

গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান (চীন)

গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান (Great Mosque of Xi'an) চীনের একটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। এটি জিয়ান শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং এটি চীনের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম মসজিদগুলোর মধ্যে একটি। মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ৭৪২ খ্রিস্টাব্দে, যা ইসলামের প্রথম শতাব্দীর সময়কাল। গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান ইসলামী এবং চীনা স্থাপত্যের একটি অনন্য সংমিশ্রণ। এর নির্মাণশৈলী এবং ডিজাইন চীনা ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের প্রভাবকে প্রতিফলিত করে। মসজিদটির মধ্যে রয়েছে সুন্দর বাগান, প্যাভিলিয়ন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা। গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান তার ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের জন্য একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করে। 

এই স্থাপনাগুলো শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মের এক অনন্য মেলবন্ধন। এগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মুসলিম স্থপতিরা তাদের সময়ে কতটা অসাধারণ কাজ করেছেন।

🔆 স্বর্ণযুগের পরিসমাপ্তি

আস্তে আস্তে একসময় বিবর্ণ হতে শুরু করে মুসলিমদের গৌরবমাখা সেই স্বর্ণযুগ। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের পর শুরু হওয়া ক্রুসেড ক্রমেই অস্থিতিশীল করে তোলে গোটা মুসলিম বিশ্বকে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ছিল খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ, যা প্রায় ৩০০ বছর ধরে চলেছিল। এই যুদ্ধগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের কাছ থেকে জেরুসালেম শহর পুনরুদ্ধার করা। প্রথম ক্রুসেডের সফলতার পর, খ্রিষ্টানরা জেরুসালেমে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। 





পরবর্তী ক্রুসেডগুলোতে মুসলমানরা ধীরে ধীরে তাদের অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডের ফলে ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে।এটি ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এর অল্প কিছুদিন পরেই তের শতকে ভেতরে ধুঁকতে থাকা মুসলিম বিশ্বের সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক ত্রাস- মঙ্গোলদের আক্রমণ। 

১২০৬ সালে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে শক্তিশালী মঙ্গোল সাম্রাজ্য, যা মধ্য এশিয়ায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।১২৫৮ সালের ২৯ জানুয়ারি হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী ও তার মিত্র শক্তিদের সামনে তছনছ হয়ে যায় আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী, তখনকার দিনের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদ। ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেরদিন চলা সেই অভিযানে মঙ্গোল বাহিনীতে ছিলো ১,২০,০০০-১,৫০,০০০ সেনা। অপরপক্ষে আব্বাসীয় খেলাফতের সেনাসংখ্যা ছিলো সেই তুলনায় বেশ কম, ৫০,০০০ প্রায়। যুদ্ধে মুসলিমরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মঙ্গোল বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা না গেলেও সেটা ছিলো খুবই নগণ্য। অন্যদিকে আব্বাসীয়দের পক্ষে থাকা সকল সেনাই সেই অভিযানে নিহত হয়েছিলেন। পাশ্চাত্য সূত্রানুযায়ী সেই যুদ্ধে প্রায় ২,০০,০০০-৮,০০,০০০ সাধারণ নাগরিক মারা গিয়েছিলেন। অপরদিকে আরব বিশ্বের মতে এ সংখ্যাটি ২০,০০,০০০ প্রায়।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, মঙ্গোলদের এ আক্রমণই ছিলো ইসলামের সোনালী যুগকে ইতিহাসের অধ্যায়ে পরিণত করার মূল নিয়ামক। কালক্রমে একসময় অটোম্যান সাম্রাজ্য উঠে দাঁড়ালেও ইসলামের সোনালী সেই যুগ আর কখনোই ফিরে আসে নি, বরং সোনালী সেই সূর্য কালে কালে অস্তমিতই হয়েছে।


November 23, 2024

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড

প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষায়িত কমান্ডো বাহিনী। এটি ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তারিখে ২টি ব্যাটালিয়ান নিয়ে গঠিত হয়। এই ব্রিগেডের মূল উদ্দেশ্য হলো "বিশেষ অপারেশন সম্পাদন করা এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা"। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে বিশেষ অভিযান ইউনিটের শুরু। বেশিরভাগই জঙ্গল যুদ্ধ এবং বিদ্রোহবিরোধী ইউনিটের আকারে ১৯৭৪ সাল থেকে, কমান্ডো ইউনিটগুলি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন নামে বিদ্যমান ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি পৃথক "বিশেষ অভিযান সক্ষম ইউনিট" প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ জুন ১৯৯২ সালে প্রথম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন হিসেবে গঠিত হয়। এটি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম অত্যাআধুনিক বিশেষ বাহিনী। ইউনিটটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ১ জুন ২০১৫ সালে জাতীয় স্বীকৃতি পায়। অ্যাড হক প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে গঠিত হয় এবং ১০ অক্টোবর ২০১৯ সালে ব্রিগেডটি তার পূর্ণ কাঠামো এবং শক্তি পায়। ব্রিগেডের আনুষ্ঠানিক পতাকা প্রথম ২৮ অক্টোবর ২০২০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা উত্তোলন করা হয়।

ইতিহাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর একটি বিশেষায়িত নগর যুদ্ধ ইউনিট ছিল ক্র্যাক প্লাটুন। ১৯৭১ সালের জুনে, সেক্টর ২ কমান্ডার খালেদ মোশাররফ এই বিশেষায়িত নগর গেরিলাদের ঢাকা শহরে পাঠান। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত অভিযান ছিল অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। এই গেরিলারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করে, যেখানে বিশ্ব ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি এবং পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ একটি সভায় অংশগ্রহণ করছিল। এই অভিযানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দশ থেকে পনেরজন সৈন্য নিহত হয় এবং অনেকে আহত হয়।

প্লাটুনের উল্লেখযোগ্য অভিযানগুলির মধ্যে রয়েছে: 

  • অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল 
  • অপারেশন ফাইভ পাওয়ার স্টেশন
  • অপারেশন ফার্ম গেট
  • অপারেশন ধানমন্ডি 
  • অপারেশন গ্রিন রোড ইত্যাদি

যুদ্ধের সময় ক্র্যাক প্লাটুন ঢাকায় ৮২টি গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে।

স্পেশাল ওয়ারফেয়ার উইং

সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে স্কুল অফ ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিক্সে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখা ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বিশেষ বাহিনীর গঠনের এটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ। ১৯৮০ সালে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখায় সেনাবাহিনীর কমান্ডো কোর্স এবং বিদ্রোহ দমন কোর্স শুরু হয়। একই বছরে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখা বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা স্কুলে পরিণত হয়। ১৯৮৮ সালে সিলেট ক্যান্টনমেন্টে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখার অধীনে সেনাবাহিনীর এয়ারবোর্ন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৯ সালে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা স্কুলে প্রথমবারের মতো প্যারা প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হয়।

১ম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন

সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে ১৯৯২ সালের ৩০ জুন ১ম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৩ সালের মে মাসে ব্যাটালিয়নের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২০০৫ সালের ১ জুন ১ম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন পূর্ণাঙ্গ রেজিমেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে অ্যাড হক প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড গঠনের পর থেকে তারা ব্রিগেডের অধীনে কাজ শুরু করে। তাদের অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭ সালের ২ নভেম্বর ব্যাটালিয়নকে জাতীয় পদমর্যাদা প্রদান করা হয়।

২য় প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন

২০১৬ সালে পারা কমান্ডো ব্রিগেডের সদর দপ্তরের সাথে সাথে অস্থায়ী ভিত্তিতে দ্বিতীয় পারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়। অবশেষে ২০১৯ সালে এটি দ্বিতীয় পারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন হিসেবে গঠিত হয়। ব্যাটালিয়নের আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানটি ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর সিলেট ক্যান্টনমেন্টে অনুষ্ঠিত হয়।

অপারেশন 

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা 

১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করছে। বর্তমানে, বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানের অন্যতম বৃহত্তম অবদানকারী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইভরি কোস্ট, দক্ষিণ সুদান, ডারফুর, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, হাইতি এবং মালিতে বিভিন্ন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রয়োগ মিশনে তার বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করেছে। BANSF প্রিফিক্স ব্যবহার করে এই বিশেষ বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত বেক্তিরা প্রায়শই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান এবং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলা করার দায়িত্ব পায়।

অপারেশন থান্ডারবোল্ট

ঢাকার গুলশান ২-এর হোলি আর্টিসান বেকারিতে ঘটে যাওয়া হামলাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ ঘটনা। ২০১৬ সালের ১ জুলাই পাঁচজন আক্রমণকারী বেকারিতে বোমা, ছুরি, একে-২২ রাইফেল এবং পিস্তল নিয়ে হামলা চালায়। রাত ৯:২০ টার দিকে তারা বেকারিতে থাকা স্থানীয় ও বিদেশীদের বন্দী করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে না পেরে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রথমে বেকারিটি নিরাপদ করার চেষ্টা করে, যার ফলে আক্রমণকারীদের সাথে গুলিবর্ষণের সময় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়। তবে, পুলিশ এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন দ্রুত বেকারির চারপাশে ঘেরাও তৈরি করে যাতে কোন আক্রমণকারী পালিয়ে যেতে না পারে।ঘন্টার পর ঘন্টা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করেও যখন অপরাধীরা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

২ জুলাই শনিবার ভোরের দিকে এক উচ্চ পর্যায়ের সরকারি বৈঠকে ১ম কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বন্দীদের মুক্ত করার জন্য ১ম কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে সিলেট থেকে ঢাকায় আনা হয়। অপারেশনটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৬তম স্বাধীন পদাতিক ব্রিগেডের অপারেশনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১ম প্যারা-কমান্ডো ব্যাটালিয়নের দ্বারা পরিচালিত হয়। র‌্যাব এবং পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কমান্ডোরা তাদের অভিযান (কোডনাম "অপারেশন থান্ডারবোল্ট") শুরু করে, যা সকাল ৭:৪০ টায় শুরু হয় এবং ৮:৩০ টায় শেষ হয়। তারা ১৩ জন বন্দীকে মুক্ত করতে এবং আক্রমণকারীদের হত্যা করতে সক্ষম হয়। এই হামলার সময় ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ২ জন বাংলাদেশী, ১ জন ভারতীয় এবং ১ জন আমেরিকানকে অপরাধীরা হত্যা করে।

সিলেটে অপারেশন টোয়াইলাইট

২০১৭ সালের ২৩শে মার্চ, বৃহস্পতিবার, বাংলাদেশ পুলিশ সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় একটি সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ঘিরে ফেলে। পরে ঢাকা থেকে একটি সোয়াট দল পুলিশ ইউনিটে যোগ দেয় এবং শুক্রবার র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের কর্মী এদের সঙ্গে যুক্ত হয়। শনিবার, প্রথম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন অপারেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এটিকে অপারেশন টুইলাইট নামকরণ করে।জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টের ১৭তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনোয়ারুল মোমেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাড হক প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডের প্রথম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন দ্বারা অপারেশন টুইলাইট শুরু করা হয়। ভবনের প্রধান ফটকটি জঙ্গিরা একটি রেফ্রিজারেটর দিয়ে বন্ধ করে দেয় যার সাথে একটি আইইডি সংযুক্ত ছিল। ভবনে ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট এবং ১৫০টি কক্ষ ছিল, জঙ্গিরা ক্রমাগত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছিল। অপারেশন শনিবার সকাল ৮ টার দিকে শুরু হয়। কমান্ডো ইউনিটকে সোয়াট এবং বাংলাদেশ পুলিশ সহায়তা করে। সুরক্ষা বাহিনী জঙ্গি আস্তানার চারপাশে তিন কিলোমিটার পরিসীমা স্থাপন করে। কমান্ডোরা বৃহস্পতিবার থেকে ভবনে আটকা পড়া ৭৮ জন বেসামরিক নাগরিককে উদ্ধার করে। প্রাথমিক আক্রমণে দুই জঙ্গি নিহত হয়। জঙ্গিরা ভবনের সর্বত্র আইইডি স্থাপন করেছিল যা সামরিক অভিযানকে ধীর করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জঙ্গিদের বের করে আনার জন্য আরপিজি এবং গোলা ব্যবহার করেছিল যা খুব বেশি সফল হয়নি। কমান্ডোরা অভিযানে বর্মিত যানবাহনও ব্যবহার করেছিল। অবশেষে আস্তানায় চার জঙ্গির মৃতদেহ পাওয়া যায়।

অপারেশন BEKPA-2

বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্স (BANSF/3) যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিরক্ষা মিশনে কেন্দ্রীয় আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহণ করে। BANSF-3 এর মেজর মোঃ শাহিদুল ইসলাম বিদ্রোহী গোষ্ঠী Unity for peace in the Central African Republic (UPC) থেকে একটি এলাকা মুক্ত করার জন্য অভিযানের নেতৃত্ব দেন। একই সময়ে, অভিযানের মাধ্যমে ১০০ জনেরও বেশি বন্দীকে উদ্ধার করা হয়।

অপারেশন POUPOU

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে মিনুস্কা অভিযানে বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্সের (BANSFC/3) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম আজাদ, SUP, নেতৃত্ব দেন তিনি সেই সময়ে BANSFC/3 এর কনটিনজেন্ট কমান্ডার ছিলেন।২০১৯ সাল এফডিপিসি সশস্ত্র গোষ্ঠী জুকুম্বো গ্রামে সকল ধরণের যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। গ্রামে ২০০-৩০০টি ঘর ছিল এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০।  ৩ এপ্রিল BANSFC/3 এবং BANBAT/5 কে অভিযানের জন্য নিযুক্ত করা হয়।  ৫ এপ্রিল: BANBAT/5 গ্রামে অবরোধ তৈরি করে এবং BANSFC/3 অভিযান শুরু করে। BANSFC/3 সদস্যরা গ্রামে প্রবেশ করে এবং ঘর থেকে ঘরে অভিযান চালিয়ে পুরো এলাকা পরিষ্কার করে। তারা ১১টি সরকারি পিকআপ এবং ৭০ জন বেসামরিক নাগরিককে উদ্ধার করে এবং FACA প্লাটুনের কাছে হস্তান্তর করে । এই অভিযানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫ জন সদস্য  নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়। শান্তিরক্ষা বাহিনীর কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে কিছু সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ময়ূরপঙ্খী অভিযান

২০১৯ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারী, ঢাকা থেকে দুবাই যাওয়ার পথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানকে পলাশ নামে একজন অস্ত্রধারী অপহরণের চেষ্টা করে। বিমানটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। যদিও তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল না, কর্তৃপক্ষ তার সাথে আলোচনা করার চেষ্টা করে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে, প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডকে হামলা শুরু করার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে কমান্ডোদের মাত্র আট মিনিট সময় লেগেছিল। ফলে, অপহরণকারীকে কমান্ডোরা গুলি করে হত্যা করে, ১৪৮ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পায়

November 22, 2024

ভারতীয় এলিট কম্যান্ডো MARCOS: সমুদ্রের সৈনিকদের অভিযান


ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি বিশেষ বাহিনী মেরিন কমান্ডো ফোর্স (MCF), সংক্ষেপে MARCOS, যা ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর পূর্বের নাম ছিল 'ভারতীয় মেরিন স্পেশাল ফোর্স'। দুই বছর পর নাম পরিবর্তন করে মেরিন কমান্ডো ফোর্স রাখা হয়। MARCOS সব ধরনের পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম; সমুদ্রে, আকাশে এবং স্থলে। পেশাদারিত্বের জন্য এই বাহিনী ধীরে ধীরে আরও অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। MARCOS নিয়মিতভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে ঝিলাম নদী এবং ৬৫ বর্গ কিলোমিটার (১৬,০০০ একর) মিঠা পানির হ্রদের মধ্য দিয়ে বিশেষায়িত সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করে এবং এই অঞ্চলে বিদ্রোহ বিরোধী অভিযান চালায়। কিছু MARCOS ইউনিট ত্রি-সেবা সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ অপারেশন বিভাগের একটি অংশ।

ইতিহাস

১৯৫৫ সালে, ভারতীয় সামরিক বাহিনী ব্রিটিশ স্পেশাল বোট সার্ভিসের সহায়তায় কোচিনে একটি ডাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করে এবং বিস্ফোরক নিষ্পত্তি, ক্লিয়ারেন্স এবং উদ্ধার ডাইভিংয়ের মতো যুদ্ধের বিভিন্ন দক্ষতা শেখানো শুরু করে। ১৯৮৩ সালে, ৩৪০ তম আর্মি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্রিগেডকে একটি উভচর অ্যাসল্ট ইউনিটে রূপান্তরিত করা হয় এবং পরবর্তী বছরগুলিতে যৌথ বায়ুবাহিত-উভচর মহড়ার একটি সিরিজ পরিচালিত হয়। এপ্রিল ১৯৮৬ সালে, ভারতীয় নৌবাহিনী একটি বিশেষ বাহিনী ইউনিট তৈরির পরিকল্পনা শুরু করে যা একটি সামুদ্রিক পরিবেশে মিশন পরিচালনা করতে, অভিযান পরিচালনা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। ডাইভিং ইউনিট থেকে তিনজন স্বেচ্ছাসেবক অফিসার নির্বাচন করা হয় এবং করোনাডোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিলদের সাথে প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করে। ফেব্রুয়ারী ১৯৮৭ সালে, ভারতীয় মেরিন স্পেশাল ফোর্স (IMSF) আনুষ্ঠানিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করে এবং তিনজন অফিসার তার প্রথম সদস্য ছিলেন। ১৯৯১ সালে IMSF-এর নাম পরিবর্তন করে 'মেরিন কমান্ডো ফোর্স' রাখা হয়।

পরিচিত কার্যক্রম এবং অপারেশন

MARCOS সব ধরনের ভূখণ্ডে অপারেশন করতে সক্ষম, কিন্তু সামুদ্রিক অপারেশনে বিশেষ পারদর্শী। বাহিনীটি সারা বিশ্বের বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে অসংখ্য যৌথ মহড়া করেছে। ২০১২ সালের হিসাবে, MARCOS-এর প্রায় ২,০০০ জন কর্মী রয়েছে। 

MARCOS দ্বারা পরিচালিত অপারেশনগুলি...

অপারেশন পবন (১৯৮৭)

ভারতীয় নৌবাহিনীর বিশেষ বাহিনী (MARCOS) নামে পরিচিত, তারা ভারতীয় শান্তি রক্ষা বাহিনীর অংশ ছিল এবং শ্রীলঙ্কার জাফনা ও ত্রিনকোমালি বন্দর দখল করতে সাহায্য করেছিল। ২১ অক্টোবর, MARCOS গুরু নগরে লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলাম (LTTE) ঘাঁটির বিরুদ্ধে একটি সফল জলবাহী অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে ১৮ জন MARCOS অংশগ্রহণ করে। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট অরবিন্দ সিং, যিনি মার্কিন নৌবাহিনীর SEAL দ্বারা প্রশিক্ষিত একজন কর্মকর্তা। এই মিশনের জন্য তাকে মহা বীর চক্র পুরস্কার প্রদান করা হয়।

অপারেশন ক্যাকটাস (১৯)

MARCOS, ভারতীয় নৌবাহিনীর অংশ হিসেবে, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি মামুন আব্দুল গাইয়ুম-এর গণতান্ত্রিক সরকারকে PLOTE এবং ENDLF থেকে শ্রীলঙ্কার জঙ্গিদের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা থেকে রক্ষা করে। ভারতের সফল সামরিক সহায়তা এই অভিযানকে সফল করে তোলে। ৪৭ জন ভাড়াটে বাহিনী এমভি প্রোগ্রেস লাইট নামক একটি জাহাজ হাইজ্যাক করে ২৩ জন জিম্মি নিয়ে সমুদ্রপথে পালানোর চেষ্টা করে। INS গোদাবরী, একটি বহু-ভূমিকাবাহী ফ্রিগেট, সিকিং হেলিকপ্টার এবং অ্যালাইজ বিমান কোচিতে নৌবাহিনীর ঘাঁটি থেকে পরিচালনা করে। গোদাবরী দুই দিন ধরে ছিনতাইকৃত জাহাজটিকে অনুসরণ করে, জাহাজের উপরিভাগে মাঝে মাঝে গুলি চালায়। একটি অ্যালাইজ অ্যান্টি-সাবমেরিন বিমান জাহাজের কাছে দুটি গভীরতা চার্জ ফেলে দেয়, যার ফলে জঙ্গিরা উপরের ডেকে উপস্থিত হয় এবং আত্মসমর্পণ করে।

অপারেশন তাশা (১৯

অপারেশন তাশা, যা অপারেশন পবনের আহত হওয়ার পর চালু করা হয়েছিল, তামিলনাড়ু উপকূলে একটি উপকূলীয় নিরাপত্তা অভিযান ছিল, যাতে সেখানে এলটিটিই-এর কার্যক্রম ব্যর্থ হয়।
সোমালিয়ায় জাতিসংঘের অপারেশন II ( UNOSOM II )
মোগাদিশুর যুদ্ধ, যা কৃষ্ণ সাগরের যুদ্ধ  নামেও পরিচিত, এটি অপারেশন গোথিক সার্পেন্ট এর আওতাধীন একটি যুদ্ধ ছিল। ১৯৯৩ সালের ৩ ও ৪ অক্টোবর সোমালিয়ার রাজধানী শহর মোগাদিশুতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। যুদ্ধের এক পক্ষে ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সমর্থিত ইউএনওএসওএম ২ (UNOSOM II), এবং অপরপক্ষে ছিলো তৎকালীন সোমালিয়ার রাষ্ট্রপতি ও মিলিশিয়াদের নেতা যুদ্ধবাজ মোহাম্মদ ফারাহ এইদিদ। যুদ্ধে এইদিদের পক্ষে অনেক বেসামরিক ব্যক্তিকেও যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছিলো। এই যুদ্ধটি মোগাদিশুর প্রথম যুদ্ধ নামেও পরিচিত, কারণ পরবর্তীকালে ২০০৬ সালে মোগাদিশুতে আরও একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা মোগাদিশুর দ্বিতীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত।

অপারেশন রক্ষক (চলমান)

জম্মু ও কাশ্মীরে কাউন্টার-ইনসারজেন্সি (COI) অপারেশন: ঝিলাম নদী ও উলার লেক জম্মু ও কাশ্মীরে, মার্কস (MARCOS) এর দুই থেকে চারটি দল সারা বছর উলার লেকে মোতায়েন করা হয়। জঙ্গিরা শ্রীনগরে পৌঁছানোর জন্য ২৫০ কি.মি. দূরত্বের এই হ্রদ ব্যবহার করতো, যা তাদের পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ১০০ কিমি (৬২ মাইল) ভ্রমণ করা থেকে বাঁচিয়েছিল। ১৯৯৫ সালে, মার্কস এর একটি দল হ্রদে অবস্থান করে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, হ্রদে জঙ্গি কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত, ৩০ জন মার্কস কর্মী উলার লেকে স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল। মার্কস ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ঝিলাম নদীর দ্বীপ থেকে জঙ্গিদের নির্মূল করতেও সাহায্য করেছে, যেখানে জঙ্গিরা বাগান ব্যবহার করে লুকানোর জায়গা তৈরি করেছিল।

কার্গিল যুদ্ধ (১৯৯৯)

কার্গিল যুদ্ধ বা কার্গিল সংঘর্ষ ১৯৯৯ সালের মে-জুলাই মাসে কাশ্মীরের কার্গিল জেলায় ভারত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত একটি সশস্ত্র সংঘর্ষ। পাকিস্তানি ফৌজ ও কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে ডি ফ্যাক্টো সীমান্তরেখা হিসেবে পরিচিত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা লাইন অফ কন্ট্রোল পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়লে এই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। যুদ্ধ চলাকালীন এবং যুদ্ধের অব্যবহিত পরে পাকিস্তান এই যুদ্ধের দায় সম্পূর্ণত কাশ্মীরি স্বাধীনতাপন্থী জঙ্গিদের উপর চাপিয়ে দেন। তবে যুদ্ধের পর ফেলে যাওয়া তথ্যপ্রমাণ ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের পরবর্তীকালের বিবৃতি থেকে স্পষ্টতই জানা যায় যে পাকিস্তানের আধাসামরিক বাহিনীও এই যুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।আর সেই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল আশরাফ রাশিদ। ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি ফৌজকে আক্রমণ করে। পরে সেনাবাহিনীকে সহায়তা দান করে ভারতীয় বিমানবাহিনীও। অবশেষে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থনের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর পাকিস্তানকে ফৌজ প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছিল।

ইয়েমেনে অপারেশন রাহাত (২০১৫)

২০১৫ সালে আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেন যুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির রাজধানী সানা এবং এর বিমানবন্দর হুতি-দের নিয়ন্ত্রণে আসার কারণে ভারত তার হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিককে সরিয়ে আনার লক্ষ্যে অপারেশন রাহাত চালু করেছিল। সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি জোট দ্বারা পরিচালিত তীব্র লড়াই এবং বিমান হামলার মধ্যে , MARCOS কে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিযানে ভারতীয় ও বিদেশী উভয় নাগরিককে উদ্ধার করা হয়।

অপারেশন ব্ল্যাক টর্নেডো 2008
২০০৮ মুম্বই জঙ্গি হামলা (যা সাধারণত ছাব্বিশে নভেম্বর বা ২৬/১১ নামে পরিচিত) হল পাকিস্তান থেকে জলপথে অনুপ্রবেশকারী কয়েকজন কুখ্যাত জঙ্গি কর্তৃক ভারতের বৃহত্তম শহর মুম্বইতে সংঘটিত ১০টিরও বেশি ধারাবাহিক গুলিচালনা ও বোমাবিস্ফোরণের ঘটনা। এই হামলার জন্য যে সব জঙ্গিরা তথ্যসংগ্রহ করত, তারা পরে স্বীকার করেছে যে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিগেন্স (আইএসআই) তাদের মদত জোগাত। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই হামলা চলে। ঘটনায় ১৬৪ জন নিহত ও কমপক্ষে ৩০৮ জন আহত হন। সারা বিশ্বে এই ঘটনা তীব্রভাবে নিন্দিত হয়।

এন্টি পাইরেসি 2008

এডেন উপসাগরে তার প্রথম পদক্ষেপে, মার্কিন নৌবাহিনী ১১ নভেম্বর ২০০৮-এ ভারতীয় বণিক জাহাজ এমভি জগ অর্ণভকে আটক করার জলদস্যুদের একটি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। ছিনতাই হওয়া সৌদি জাহাজটিতে ১০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের তেল ছিল। জাহাজটির সঙ্গে পণবন্দী হওয়া ২৫ জন ক্রুর মধ্যে সৌদি আরব, ব্রিটেন, ক্রোয়েশিয়া, ফিলিপিন্স এবং পোল্যান্ডের নাগরিক ছিলেন। ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা। জাহাজটি ছাড়িয়ে নিতে এর মালিককে আড়াই কোটি মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দিতে ১০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিল জলদস্যুরা।

এক্সারসাইজ 'ব্যালেন্স ইরোকুইস' 03-1/বজ্র প্রহর 2003

MARCOS মিজোরামে ইউএস স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সাথে 'ব্যালেন্স ইরোকুইস' 03-1/বজ্র প্রহর নামে যৌথ প্রশিক্ষণ অনুশীলনে অংশ নিয়েছিল।

এন্টি পাইরেসি ২০০৮

১৩ ডিসেম্বর ২০০৮-এ ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ INS মাইসোর (D60) থেকে পরিচালিত MARCOS ইউনিট সোমালি উপকূলে ইথিওপিয়ান জাহাজ এমভি গিবের জলদস্যু ছিনতাইয়ের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে। এই অভিযানে তেইশ জন জলদস্যুকে গ্রেফতার করে।

এন্টি পাইরেসি ২০১১

১৬ জুলাই ২০১১-এ, আইএনএস গোদাবরী এবং MARCOS এডেন উপসাগরে একটি গ্রীক জাহাজ এমভি এলিনাকোসে জলদস্যুতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে।

এন্টি পাইরেসি ২০১৩

১২ আগস্ট ২০১৩-এ, ভারতীয় নৌবাহিনী একটি ইরানী পণ্যবাহী জাহাজ নাফিস-১ দেখতে পায়, যা আরব সাগরে অফকোর্স ছিল। জাহাজটির উপর নজরদারি ১৪ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, যখন হেলিকপ্টার এবং আইএনএস মাইসোর থেকে সহায়তার মাধ্যমে জাহাজটিকে আটকাতে একটি নয়-শক্তিশালী MARCOS ইউনিট মোতায়েন করা হয়। কমান্ডোরা ছিনতাইকারীদের আটক করে। ইরানি জাহাজটি ইরানের চা বাহার থেকে রওনা হয়েছিল বলে জানা গেছে। নৌবাহিনীর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে জাহাজটি অস্ত্র ও মাদক পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। বোর্ডে পাওয়া স্বয়ংক্রিয় হামলার অস্ত্রের একটি দোকান বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

এন্টি পাইরেসি ২০১৭

১৬ মে, MARCOS এডেন উপসাগরের কাছে একটি লাইবেরিয়ান জাহাজ থেকে একটি দুর্দশা কলে সাড়া দিয়ে জলদস্যুতার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। ৬ অক্টোবর, MARCOS এডেন উপসাগরে জলদস্যুদের দ্বারা ওভারটেক করা একটি ভারতীয় বাল্ক ক্যারিয়ারকে উদ্ধার করে।

দুবাইয়ের রাজকুমারী শেখা লতিফাকে উদ্ধার ২০১৮

প্রিন্সেস লতিফা হচ্ছেন দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের ২৫ ছেলেমেয়ের একজন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পারিবারিক বিধিনিষেধ ভাঙার চেষ্টায় তিনি তার বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং সেই সময় তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। তার এই পালানোর চেষ্টা ছিল একটি অত্যন্ত নাটকীয় ঘটনা। পালানোর পর, লতিফা একটি ভিডিওতে দাবি করেন যে, তাকে বন্দী অবস্থায় একটি ভিলায় রাখা হয়েছে যেখানে জানালা খোলা যায় না এবং বাইরে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো লতিফার মুক্তির জন্য আহ্বান জানায়। এরপর তিনি ভারত মহাসাগরে একটি নৌকায় ধরা পড়েন এবং কমান্ডোরা তাকে দুবাইয়ে ফিরিয়ে দেয়।

চীন-ভারত সংঘর্ষ (2020)

2020 সালের অক্টোবরে, হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে যে চীনা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পূর্ব লাদাখে মার্কস মোতায়েন করা হচ্ছে । পরবর্তী রিপোর্ট অনুসারে, MARCOS প্যাংগং সো হ্রদের আশেপাশে উপস্থিত রয়েছে যেখানে তারা শীঘ্রই নৌকা ব্যবহার করে মিশন পরিচালনা করবে।


এন্টি পাইরেসি ২০২৩

২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর, মাল্টার পণ্যবাহী জাহাজ এমভি রুয়েন ছয় জলদস্যুর দ্বারা ছিনতাই করা হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী এসওএস সংকেত পেয়ে এডেন উপসাগরে জাহাজটিকে ট্র্যাক করতে শুরু করে। চার দিন পর, আহত নাবিককে উদ্ধার করে ওমানে পাঠানো হয়। তিন মাসের বেশি সময় ধরে সোমালি উপকূলে জলদস্যুরা জাহাজটি মাদারশিপ হিসেবে ব্যবহার করে। ১৫ মার্চ, আইএনএস কলকাতা জাহাজটি ২৬০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে জলদস্যুদের কোণঠাসা করে। চল্লিশ ঘণ্টা পর, ৩৫ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে এবং ১৭ জন জিম্মি ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়। আইএনএস সুভদ্রা টহল জাহাজ, HALE RPA ড্রোন, পি৮আই বিমান এবং আট মেরিন কমান্ডো এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। 

MARCOS-এর সাহসী অভিযান: জলদস্যুদের হাত থেকে জাহাজ এবং ক্রুদের উদ্ধার (২০২৪)

  • ২০২৪ সালের জানুয়ারী ও মার্চ মাসে, ভারতীয় নৌবাহিনীর MARCOS দল আরব সাগর এবং সোমালিয়ান জলরাশিতে জলদস্যুদের হাত থেকে জাহাজ এবং ক্রুদের উদ্ধার করতে বেশ কয়েকটি সাহসী অভিযান পরিচালনা করে।
  • ৫ জানুয়ারী: INS চেন্নাই থেকে MARCOS এমভি লীলা নর্ফোক থেকে ২১ জন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করে।
  • ১৮ জানুয়ারী: এমভি জেনকো পিকার্ডি হুথি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার থেকে সুরক্ষিত করে।
  • ২৪ জানুয়ারী: আইএনএস সুমিত্রা থেকে MARCOS ১৭ জন ইরানী জিম্মিকে এফভি ইমানে থেকে মুক্ত করে।
  • ২৯ জানুয়ারী: আল নাঈমি মাছ ধরার নৌকা ১৯ জন পাকিস্তানি ক্রু সদস্য সহ সোমালি জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে।
  • ২৯ জানুয়ারী: আইএনএস শারদা থেকে MARCOS, সেশেলস পিপলস ডিফেন্স ফোর্স এবং শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনী সাথে লরেঞ্জো পুথা 04 উদ্ধার করে।
  • ১৭ মার্চ: INS কলকাতা এবং MARCOS PRAHARs এমভি রুয়েন থেকে ১৭ জন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করে এবং ৩৫ জন জলদস্যুকে আটক করে। আইএনএস সুভদ্রা, ইউএভি এবং পি-৮আই বিমান এই অভিযানে সহায়তা করে।

এই অভিযানগুলিতে MARCOS দলের সাহস এবং দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ভারতীয় নৌবাহিনী আরব সাগর এবং সোমালিয়ান জলরাশিতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং জলদস্যুতা রোধে নিবেদিত।

অপারেশনাল দায়িত্ব

MARCO অপারেশনগুলি সাধারণত নৌবাহিনীর সমর্থনে পরিচালিত হয়, যদিও MARCOS অন্যান্য ডোমেনে মোতায়েন করা হয়। MARCOS এর দায়িত্ব সময়ের সাথে বিকশিত হয়েছে।  মার্কোসের কিছু কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে:- 

  • উভচর ক্রিয়াকলাপগুলিতে সহায়তা প্রদান।
  • বিশেষ নজরদারি এবং উভচর রিকনেসান্স অপারেশন।
  • ডাইভিং অপারেশন এবং বিশেষ অভিযান সহ শত্রু অঞ্চলের অভ্যন্তরে গোপনীয় অপারেশন।
  • সরাসরি কর্ম
  • জিম্মি উদ্ধার অভিযান।
  • সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।
  • অসমমিত যুদ্ধ ।
  • বিদেশী অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ।
  • উপরন্তু, MARCOS ভারতীয় বিমান বাহিনীকে শত্রুর এয়ার ডিফেন্স (SEAD) মিশন দমনে সহায়তা করতে পারে।

ঘাঁটি সমূহ
MARCOS-এর বিভিন্ন অপারেশনাল ঘাঁটি রয়েছে, যা ভারতীয় উপকূল এবং সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানে (মুম্বাই, বিশাখাপত্নম, গোয়া, কোচি, পোর্ট ব্লেয়ার) অবস্থিত। এই ঘাঁটিগুলি বিশেষভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং জলদস্যুতা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত। আইএনএস কর্ণ ১২ জুলাই ২০১৬ তারিখে কমিশন করা হয়েছিল বিশাখাপত্নমের কাছে। এটি গ্যারিসন এবং ইউনিটের জন্য একটি স্থায়ী ঘাঁটি।
MARCOS-এর নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ 
MARCOS কর্মীরা ভারতীয় নৌবাহিনীর ২০ বছর বয়সে উপনীত কর্মীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়। তাদের কঠোর নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণ পরিচালনা করতে হয়।
প্রশিক্ষণ পদ্ধতি
  • বায়ুবাহিত অপারেশন 
  • যুদ্ধ ডাইভিং কোর্স 
  • কাউন্টার-টেররিজম 
  • অ্যান্টি-হাইজ্যাকিং
  • অ্যান্টি-পাইরেসি অপারেশন 
  • সরাসরি অ্যাকশন
  • অনুপ্রবেশ এবং বহিষ্কার কৌশল
  • বিশেষ পুনরুদ্ধার এবং অপ্রচলিত যুদ্ধ  
MARCOS (মেরিন কমান্ডো ফোর্স) এর প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর এবং সুসংগঠিত। এই প্রশিক্ষণ প্রধানত INS অভিমন্যুতে পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত স্কুলে অপ্রচলিত যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নিচে MARCOS-এর প্রশিক্ষণের কিছু মূল দিক তুলে ধরা হলো:
প্রশিক্ষণের স্থান
  • INS অভিমন্যু: প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
  • প্যারা এসএফ ইন্ডিয়ান স্পেশাল ফোর্সেস ট্রেনিং স্কুল, নাহান।
  • জুনিয়র লিডারস কমান্ডো ট্রেনিং ক্যাম্প, বেলগাম, কর্ণাটক।
  • মাউন্টেন কমান্ডো স্কুল, তাওয়াং, অরুণাচল প্রদেশ।
  • ডেজার্ট ওয়ারফেয়ার স্কুল, রাজস্থান।
  • হাই অল্টিটিউড ওয়ারফেয়ার স্কুল (HAWS), সোনামার্গ, কাশ্মীর।
  • কাউন্টার-ইনসারজেন্সি অ্যান্ড জঙ্গল ওয়ারফেয়ার স্কুল (CIJWS), ভাইরেং, মিজোরাম।
প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া
প্রাক-প্রশিক্ষণ নির্বাচন- দুই অংশে বিভক্ত।
  1. শারীরিক সুস্থতা ও যোগ্যতা পরীক্ষা: তিন দিনের পরীক্ষা, যেখানে 80% আবেদনকারী স্ক্রিন আউট হয়।
  2. 'হেল'স উইক:   হেল'স উইক মূলত শারীরিক এবং মানসিক সহনশীলতা পরীক্ষা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি প্রশিক্ষণার্থীদের কঠোর পরিস্থিতিতে কাজ করার ক্ষমতা এবং দলগত কাজের দক্ষতা উন্নত করে।সাধারণত, হেল'স উইক ৫ দিন এবং ৬ রাতের একটি অত্যন্ত কঠিন প্রশিক্ষণ পর্ব। এই সময়ে প্রশিক্ষণার্থীদের মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এই সময়ে প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কার্যকলাপ করতে হয়, যেমন: সাঁতার, দৌড়, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক চ্যালেঞ্জ
প্রশিক্ষণের সময়কাল: মোট ৭ থেকে ৮ মাস।
প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু
  1. বিদ্রোহ বিরোধী ও সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান: মাঠের অপারেশন।
  2. জিম্মি উদ্ধার, শহুরে যুদ্ধ, জলদস্যুতা: বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ।
  3. অস্ত্র প্রশিক্ষণ: ছুরি, ক্রসবো, স্নাইপার রাইফেল, হ্যান্ডগান, অ্যাসল্ট রাইফেল, সাবমেশিন বন্দুক এবং খালি হাতে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ।
  4. ডুবুরি প্রশিক্ষণ: পানির নিচে সাঁতার কেটে প্রতিকূল উপকূলে পৌঁছানোর দক্ষতা।
  5. 80-85% স্বেচ্ছাসেবক যারা নথিভুক্ত হন, তারা MARCOS হিসাবে যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। এই প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া MARCOS-এর সদস্যদের উচ্চমানের দক্ষতা এবং সাহসিকতা নিশ্চিত করে, যা তাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম করে।
আরও প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে: 
  • খোলা এবং বন্ধ সার্কিট ডাইভিং
  • উন্নত অস্ত্র দক্ষতা, ধ্বংস, সহনশীলতা প্রশিক্ষণ এবং মার্শাল আর্ট সহ মৌলিক কমান্ডো দক্ষতা
  • বায়ুবাহিত প্রশিক্ষণ
  • বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণ
  • সাবমার্সিবল ক্রাফটের অপারেশন
  • অফশোর অপারেশন
  • সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান
  • সাবমেরিন থেকে অপারেশন
  • স্কাইডাইভিং
  • বিভিন্ন বিশেষ দক্ষতা যেমন ভাষা প্রশিক্ষণ, সন্নিবেশ পদ্ধতি ইত্যাদি।
  • বিস্ফোরক অস্ত্র নিষ্পত্তি কৌশল