December 29, 2024

বিশ্বাস ব্যবস্থার সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি, অযুক্তির যুক্তি।

অন্ধবিশ্বাস কী? 

অন্ধবিশ্বাস হলো এমন একটি বিশ্বাস বা অনুশীলন যা অযৌক্তিক বা অতিপ্রাকৃতিক বলে মনে করা হয়, যা প্রায়শই ভাগ্য বা জাদু দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। এটি সাধারণত অজানার ভয় বা বোঝার অভাব থেকে উদ্ভূত হয়। 

অন্ধবিশ্বাসের কারণ

  • মানুষ যখন কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করতে অসমর্থ হয়, তখন সে অন্ধবিশ্বাসের আশ্রয় গ্রহণ করে। অজ্ঞতা, ভয়, অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ, ঐতিহ্য, ধর্ম, এবং অন্যান্য কারণ অন্ধবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে।
  • অন্ধবিশ্বাস প্রায়শই অনুষ্ঠান বা কর্মের সাথে জড়িত যা ভাগ্যকে প্রভাবিত করতে বা দুর্ভাগ্য প্রতিরোধ করতে বিশ্বাস করা হয়। 

অন্ধবিশ্বাসের সাধারণ উদাহরণ: 

  • কালো বিড়াল: অনেক সংস্কৃতিতে, কালো বিড়ালের সাথে পথ অতিক্রম করা দুর্ভাগ্য বলে মনে করা হয়। 
  • আয়না ভাঙা: এটি প্রায়শই সাত বছরের দুর্ভাগ্য আনতে বলা হয়। শুভ লক্ষণ: খরগোশের পা বা চার পাতার ত্রিপত্রের মতো জিনিসগুলি ভাগ্যবান বলে বিশ্বাস করা হয়।
অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব 

অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। মানুষের মনোবল হ্রাস করে, ভয় বৃদ্ধি করে, সমাজের প্রতি বিশ্বাস হ্রাস করে এই সব প্রভাব অন্ধবিশ্বাস ফেলতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে শুক্রবার শুভ দিন না, তাহলে সে শুক্রবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে ভয় পেতে পারে। এই ভয় তার মনোবল হ্রাস করতে পারে এবং তার জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবার, কোনো মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে কালো বিড়াল দেখলে অমঙ্গল হবে, তাহলে সে কালো বিড়াল দেখলে ভয় পেতে পারে। এই ভয় তার জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং তার সমাজের প্রতি বিশ্বাস হ্রাস করতে পারে।

শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাসের উপর প্রভাব:
অন্ধবিশ্বাস মানুষের শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাসের উপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আসুন, এই প্রভাবগুলোকে বিস্তারিতভাবে দেখি
  • জ্ঞানহীনতা বৃদ্ধি: অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ অনেক সময় বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং যুক্তি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে, তাদের জ্ঞানহীনতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
  • বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রতিবন্ধকতা: অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ বিশ্বাস করে যে কিছু রোগের চিকিৎসা শুধুমাত্র প্রার্থনা বা তাবিজের মাধ্যমে সম্ভব, তাহলে সে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়।
  • সামাজিক চাপ: অনেক সময় সমাজে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাসের কারণে শিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে সংকোচ বোধ করে। এটি তাদের শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে এবং বিজ্ঞানী হতে আগ্রহী তরুণদের উৎসাহ কমিয়ে দেয়।
  • বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির বাধা: অন্ধবিশ্বাসের কারণে সমাজে কিছু কুসংস্কার এবং ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং উদ্ভাবনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অঞ্চলে অন্ধবিশ্বাসের কারণে টিকাদান বা চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা দেখা যায়।
  • মানসিক স্বাস্থ্য: অন্ধবিশ্বাস মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে। যখন মানুষ অযৌক্তিক ভয়ের কারণে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে অগ্রাহ্য করে, তখন তাদের মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ বাড়তে পারে।
সামাজিক জীবনের উপর প্রভাব:
অন্ধবিশ্বাস মানুষের সামাজিক জীবনের উপর বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আসুন, এই প্রভাব গুলো বিস্তারিতভাবে দেখি
  • সামাজিক বিভাজন: অন্ধবিশ্বাসের কারণে সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, গোত্র এবং সামাজিক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষদের প্রতি অবিশ্বাস এবং অনাস্থা পোষণ করে যা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে।
  • কুসংস্কার: অন্ধবিশ্বাস সমাজে কুসংস্কার প্রচার করে যা মানুষের সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অঞ্চলে মানুষ বিশ্বাস করে যে কালো বিড়াল দেখলে অমঙ্গল হবে এবং এই বিশ্বাস মানুষের সামাজিক জীবনে ভয় এবং অনাস্থা সৃষ্টি করে।
  • বৈষম্য: অন্ধবিশ্বাস মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্রের মানুষদের প্রতি অনাস্থা পোষণ করে যা সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
  • সামাজিক উন্নয়নের বাধা: অন্ধবিশ্বাস সমাজের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অঞ্চলে অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সামাজিক সেবা গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে।
  • সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি: অন্ধবিশ্বাস মানুষের মধ্যে বিশ্বাস হ্রাস করে এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষ পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে যা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি করে।

অন্ধবিশ্বাস কেন স্থায়ী? 

  • মানসিক সান্ত্বনা: অনেকে, বিশেষ করে অনিশ্চিত সময়ে, অনুষ্ঠানে সান্ত্বনা পান। 
  • সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: অন্ধবিশ্বাস প্রায়শই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসে, একটি সম্প্রদায়ের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

December 26, 2024

কুর্দি জনগণের ভবিষ্যৎ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

 

কুর্দিস্তান অঞ্চলটি আধুনিক তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, ইরান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি প্রায় ৩ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কুর্দি জনগণের সংখ্যা প্রায় পৌনে তিন কোটি। এর মধ্যে তুরস্কে প্রায় ২০%, ইরাকে ১৫%, ইরানে ১০%, এবং সিরিয়ায় ৯% কুর্দি জনগণ বসবাস করে। কুর্দিদের সংস্কৃতি তাদের ভাষা, গান, নৃত্য এবং লোককাহিনীর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাদের নিজস্ব ভাষা, কুর্দি, ইরানি ভাষা পরিবারের একটি অংশ। কুর্দিরা তাদের স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী তুর্কি ও আরবদের থেকে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। তবে তাদের সংস্কৃতিগত মিলের কারণে ইরানিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও রয়েছে। কুর্দিরা কখনোই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি, তবে তারা বিভিন্ন সময় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে। তাদের ইতিহাসে সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর মতো মহান নেতাদের নাম উল্লেখযোগ্য।

কুর্দি জনগোষ্ঠী একটি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক, কিন্তু তারা স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বেশ কিছু জটিল কারণে। আসুন, এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে দেখি:

১. রাজনৈতিক বিভাজন- কুর্দিরা মূলত তুরস্ক, ইরাক, ইরান, এবং সিরিয়া—এই চারটি দেশের মধ্যে বিভক্ত। প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের কারণে কুর্দিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করে আসছে।

২. ইতিহাসের প্রেক্ষাপট- কুর্দি জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯২০ সালের সেভর চুক্তির মাধ্যমে কুর্দিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, পরবর্তীতে লজান চুক্তি দ্বারা তা বাতিল করা হয়। ফলে কুর্দিরা রাষ্ট্রহীন অবস্থায় পড়ে যায়।

৩. সামরিক দমন- কুর্দিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করতে তুরস্ক, ইরাক, ইরান এবং সিরিয়া সরকারগুলো বিভিন্ন সময়ে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্কের সরকার কুর্দি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যা কুর্দিদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করেছে।

৪. অভ্যন্তরীণ বিভাজন- কুর্দি জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনও একটি বড় সমস্যা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধের কারণে তাদের আন্দোলনকে সংগঠিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

৫. আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব- কুর্দিদের স্বাধীনতা আন্দোলন আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট সমর্থন পায়নি। যদিও কিছু দেশ কুর্দিদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

৬. অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ- কুর্দি অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক সময় দুর্বল। এই কারণে তারা নিজেদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহ করতে পারে না।

তুরস্ক কেন কুর্দিদের হুমকি মনে করে?

তুরস্ক এবং কুর্দিদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস সত্যিই জটিল এবং দীর্ঘ। এই সংঘাতের পেছনে অনেকগুলি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। এখানে কিছু মূল কারণ তুলে ধরা হলো:

জাতিগত পরিচয় ও নীতি: তুরস্কের জনসংখ্যার ১৫ থেকে ২০% কুর্দি। কুর্দিদের প্রতি তুরস্কের কর্তৃপক্ষের কঠোর নীতি, বিশেষ করে ১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয়কে অস্বীকার করেছে। কুর্দিদের নাম এবং পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

পিকেকের গঠন: ১৯৭৮ সালে আবদুল্লাহ ওচালান পিকেকে (PKK) গঠন করেন, যার মূল দাবি ছিল তুরস্কের মধ্যে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র গঠন। এর পর থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়, যা আজ পর্যন্ত চলমান। এই সংঘাতের ফলে ৪০,০০০ এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ কুর্দি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে পিকেকে স্বাধীনতার দাবি বাদ দিয়ে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। ২০১৩ সালে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হলেও, ২০১৫ সালে সিরিয়ার সীমান্তে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর পরিস্থিতি আবারও খারাপ হয়ে যায়। তুরস্ক সরকার পিকেকে এবং ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে, যা 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সমন্বিত যুদ্ধ' হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ থেকে তুরস্ক সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সেনা উপস্থিতি অব্যাহত রেখেছে এবং বিভিন্ন শহর দখল করেছে, যা কুর্দি বিদ্রোহীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক সরকার দাবি করে যে, ওয়াইপিজি এবং পিওয়াইডি সাবেক পিকেকে'র সাথে সম্পৃক্ত এবং তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনা করছে।

সিরিয়ার কুর্দিরা কী চায়?

সিরিয়ার কুর্দিরা বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তাদের প্রধান চাওয়া ও দাবি গুলো হলো:

স্ব-শাসন: সিরিয়ার কুর্দিরা নিজেদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল চায়, যেখানে তারা নিজেদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
নিরাপত্তা: কুর্দিরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, বিশেষ করে তুরস্কের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে। তারা নিজেদের সুরক্ষা বাহিনী গঠন করেছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সমর্থন চায়।
রাজনৈতিক স্বীকৃতি: কুর্দিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বীকৃতি দাবি করছে। তারা চায় যে তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন: কুর্দিরা তাদের অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও কাজ করছে, যাতে তারা নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।

বর্তমানে সিরিয়ার কুর্দিরা একটি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যেখানে তারা বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চেষ্টা করছে। তাদের এই চাওয়া ও দাবি বাস্তবায়নের জন্য তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতা খুঁজছে।

ইরাকের কুর্দিরা কি স্বাধীনতা পাবে?

ইরাকের জনসংখ্যার আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ ভাগ কুর্দি। ঐতিহাসিকভাবে, আশেপাশের যে কোনো রাষ্ট্রে বসবাসরত কুর্দিদের চেয়ে বেশি নাগরিক অধিকার এবং সুবিধা ভোগ করেছে তারা। কিন্তু তারা অন্যদের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর অত্যাচারেরও শিকার হয়েছে।

১৯৪৬ সালে ইরাকে স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে লড়াই করার জন্য মুস্তাফা বাজরানি কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (কেডিপি) গঠন করেন। তবে তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে ১৯৬১ সাল থেকে। 

৭০ দশকের শেষদিকে কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে আরবদের পুনর্বাসন শুরু করে সরকার। বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ কিরকুক অঞ্চলের কুর্দিদের সেখান থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় পুনর্বাসন শুরু করা হয়। ৮০ দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এই নীতি আরো বিস্তার লাভ করে, সেসময় কুর্দিরা ইরানকে সমর্থন করে।

১৯৮৮ সালে কুর্দিদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাবশত অভিযান শুরু করেন সাদ্দাম হুসেইন, যার অংশ হিসেবে হালাবজা অঞ্চলে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে যখন ইরাকের পরাজয় হয়, কুর্দি বিদ্রোহীরা তখন বাগদাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ঐ বিদ্রোহ দমনে ইরাকের কর্তৃপক্ষের নেয়া সহিংস পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোট উত্তরে 'নো ফ্লাই জোন' ঘোষণা করে যার ফলে কুর্দিরা সেসব অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। দুই পক্ষের ক্ষমতা ভাগাভাগি সংক্রান্ত একটি চুক্তি করা হলেও ১৯৯৪ সালে ইরাকের কুর্দি দলগুলো চার বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়।

২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যেই আক্রমণে সাদ্দাম হুসেইন ক্ষমতাচ্যুত হন, ঐ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করে কুর্দিরা। তার দু'বছর পর উত্তর ইরাকের তিনটি প্রদেশে কুর্দিস্তান রিজিওনাল গভর্নমেন্ট (কেআরজি) প্রতিষ্ঠা করে সেসব এলাকার জোট সরকারের অংশ হয়।

সেপ্টেম্বর ২০১৭ কুর্দিস্তান অঞ্চলে এবং ২০১৪ সালে কুর্দি মিলিশিয়াদের দখল করা বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর মানুষ একটি গণভোটে অংশ নেয়। সেসময় ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এই গণভোটকে অবৈধ দাবি করে এর বিরোধিতা করে। গণভোটে অংশ নেয়া ৩৩ লাখ মানুষের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। বাগদাদ কর্তৃপক্ষ ঐ গণভোটের ফল নাকচ করার প্রস্তাব করে। পরের মাসে ইরাকের সরকার সমর্থক বাহিনী কুর্দিদের দখলে থাকা বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর দখল নেয়। কিরকুক অঞ্চল এবং সেখানকার তেল থেকে পাওয়া আয় শেষ হয়ে যাওয়ায় কুর্দিদের নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের আশা বড় ধাক্কা খায়।

আইএস'এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুর্দিরা কেন মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল? 

২০১৩ মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক স্টেট গ্রুপ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের তিনটি কুর্দি ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ঐ অঞ্চলে তাদের চালানো একের পর এক হামলা ২০১৪ মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কুর্দি মিলিশিয়া বাহিনীগুলো প্রতিরোধ করতে থাকে। 

জুন ২০১৪ উত্তর ইরাকে আইএস'এর আগ্রাসনের ফলে ইরাকের কুর্দিরাও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইরাকের স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের সরকার এমন অঞ্চলে তাদের পেশমার্গা বাহিনী পাঠায় যেখানে ইরাকের সৈন্যদের অবস্থান ছিল না। আইএস আচমকা আগ্রাসন শুরু করলে বেশ কয়েকটি অঞ্চল থেকে পেশমার্গা বাহিনী সরে আসে। ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘুদের বসবাস ছিল, এমন বেশ কয়েকটি অঞ্চলের পতন হয় - যার মধ্যে একটি হলো সিঞ্জার, যেখানে হাজার হাজার ইয়াজিদিকে আইএস আটক করে রাখে এবং হত্যা করে। ওই আগ্রাসন থামাতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী উত্তর ইরাকে বিমান হামলা চালায় এবং পেশমার্গাদের সাহায্য করতে সামরিক উপদেষ্টা পাঠায়। তিন দশক ধরে তুরস্কে কুর্দি স্বায়ত্বশাসনের লক্ষ্যে লড়াই করা ওয়াইপিজি এবং পিকেকে'ও তাদের সহায়তায় যোগ দেয়। 

সেপ্টেম্বর ২০১৪'তে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের কুর্দি শহর কোবানে'তে হামলা চালায় আইএস, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। তবে ঐ সংঘাত তুরস্কের সীমান্তের অনেক কাছে হলেও তুরস্ক আইএস ঘাঁটিতে হামলা করা বা তুরস্কের কুর্দিদের সীমানা পার করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার অনুমতি দেয়া থেকে বিরত থাকে। 

২০১৫ জানুয়ারিতে এক যুদ্ধের পর কুর্দি বাহিনী কোবানের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করে। ঐ যুদ্ধে অন্তত ১৬০০ মানুষ মারা যায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী, সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস জোট এবং একাধিক আরব মিলিশিয়া বাহিনীকে কুর্দিরা বিভিন্নভাবে সাহায্য করে সিরিয়া থেকে আইএস'কে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করতে। এখন উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় একটি ৩২ কিলোমিটার 'নিরাপদ অঞ্চল' প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের সীমান্ত রক্ষা করতে এবং ২০ লক্ষ সিরিয়ান শরণার্থীকে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে তুরস্ক কুর্দিদের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান শুরু করেছে। 

November 24, 2024

কালারিজম: একটি গভীর ব্যাধি

ত্বকের রঙের উপর ভিত্তি করে বৈষম্য, যা সাধারণত "কালারিজম" নামে পরিচিত, একটি সামাজিক সমস্যা যা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান। 
কালারিজমের কারণে অনেক মানুষ মানসিক চাপ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবের শিকার হন। এটি তাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

দক্ষিণ এশিয়ায় কালো মেয়েদের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং পশ্চিমা বিশ্বে এর প্রতিফলন আজও বিদ্যমান। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য সৃষ্টি করে। যখন কোন ব্যক্তিকে তার জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ভিন্নভাবে আচরণ করা হয়, তখন তারা জিনগত বৈষম্যের শিকার হয়ে পড়ে। এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট জিনের মিউটেশন বা কম প্রভাবশালী জিনগত বৈচিত্র্যের সমন্বয় যা স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করা হয়।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ: 

ত্বকের রঙের ভিত্তিতে বৈষম্য একটি অবৈজ্ঞানিক ধারণা। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের ত্বকের রঙের পার্থক্য মূলত মিউটেশন এবং জিনগত বৈচিত্র্যর কারণে ঘটে। এটি মানবজাতির অভিযোজনের একটি অংশ, এবং এর সাথে মানুষের গুণাবলী বা সক্ষমতার কোনো সম্পর্ক নেই।

কালারিজম বা গায়ের রঙের ভিত্তিতে বৈষম্য একটি সামাজিক সমস্যা, যা একই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ফর্সা বা হালকা গায়ের রঙের মানুষের প্রতি বিশেষ সুবিধা প্রদান করে। এর ফলে নিম্নলিখিত প্রভাবগুলো দেখা যায়:

মানসিক স্বাস্থ্য: কালারিজমের কারণে অনেক মানুষ মানসিক চাপ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবের শিকার হন। যারা গায়ের রঙের কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তারা নিজেদেরকে অবমূল্যায়িত মনে করেন।

সামাজিক সম্পর্ক: গায়ের রঙের ভিত্তিতে বৈষম্য সামাজিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি বন্ধুত্ব, প্রেম এবং পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে।

অর্থনৈতিক সুযোগ: অনেক ক্ষেত্রে, ফর্সা গায়ের রঙের মানুষদের চাকরি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যা অন্যদের জন্য বৈষম্য সৃষ্টি করে।

সাংস্কৃতিক প্রভাব: কালারিজমের কারণে সমাজে সৌন্দর্যের একটি সংকীর্ণ সংজ্ঞা তৈরি হয়, যা গায়ের রঙের ভিত্তিতে মানুষের মূল্যায়ন করে।

এটি একটি গুরুতর সমস্যা, এবং এর বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সামাজিক পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। সমাজে সকলের সমান মর্যাদা এবং সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এবং কালারিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। আমরা সকলেই মানুষ, এবং আমাদের সকলের সমান মর্যাদা এবং সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে। 

এই বৈষম্য মোকাবেলা করতে হলে আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সমাজে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।

ইসলামের স্বর্ণযুগ: ৮ম শতাব্দী থেকে ১৩ শতাব্দী পর্যন্ত।


রাসূল (সা.) ইন্তেকালের পরবর্তী সময়ে খুলাফায়ে রাশেদীনরা ইসলামের প্রচার এবং বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর তারা আরও অনেক অঞ্চল জয় করেন এবং সেখানে ইসলাম প্রচার করেন। ৭৫০ সালের মাঝেই উমাইয়া খিলাফতের নেতৃত্বে ইসলামি সাম্রাজ্য স্পেন ও মরক্কো হতে ভারতবর্ষ ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 

এই সময়ের খলিফাগণ মনে করতেন ইসলামি সমাজে জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ হওয়া প্রয়োজন। তারা বিশ্বাস করতেন ইসলামি সমাজ এমন হওয়া উচিত যেখানে বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতি ইসলামের সাথে ও ইসলামের অংশ হিসেবে বিকশিত হবে। তারা মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদী, খৃষ্টান, মুক্ত চিন্তার মানুষ এবং অন্যান্যদেরও বাগদাদ এবং কায়রোর মতো বিখ্যাত শহরগুলোয় অবস্থান করতে দিয়েছেন এবং সেখানে একটি উন্নত সভ্যতার সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তী কয়েকশ বছরব্যাপী উন্নতির শীর্ষে থাকা এই সভ্যতাই খ্রিস্টীয় ইউরোপে মধ্যযুগ হিসেবে পরিচিত।

ইসলামের এই সমস্ত ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলে আমাদেরকে একটি শব্দ-যুগলের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো "ইসলামের স্বর্ণযুগ"। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, 

১. কোন সময়টাকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়? আর কেনই বা এমনটা বলা হয়ে থাকে? 

২. কীভাবে এই স্বর্ণযুগের উত্থান হয়েছিল এবং এই সময়ের প্রধান অর্জনগুলি কী কী ছিল ? 

৩. স্বর্ণযুগ কীভাবে শেষ হয়েছিল? অন্য কথায়, ইসলামের ইতিহাসে সেই গৌরবোজ্জ্বল সময়ের পতনের কারণগুলি কী কী ছিল?

আজকে ইসলামের স্বর্ণযুগের উত্থান, সেই সময়কার নানা নিদর্শন এবং পরবর্তীকালীন গৌরবোজ্জ্বল সময়ের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হবে। 

ইসলামের স্বর্ণযুগ
ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল সাধারণত ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয় এবং ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যখন মঙ্গোলরা বাগদাদকে ধ্বংস করে। এই সময়ে বাগদাদে বাইতুল হিকমাহ (জ্ঞানের ঘর) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। কিছু ইতিহাসবিদ ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কালকে ১৬ শতক পর্যন্ত প্রসারিত করেন, তবে বেশিরভাগ পণ্ডিত এই সময়সীমাকে অতিক্রান্ত মনে করেন। তারা মনে করেন যে, স্বর্ণযুগের প্রকৃত অবদান এবং প্রভাব ১৫শ শতকের পর থেকে কমতে শুরু করে।। ইসলামী স্বর্ণযুগের সময়কাল ইউরোপীয় অন্ধকার যুগ (৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর (১৩ থেকে ১৫ শতক) সময়কালের সাথে মিলে যায়, যখন ইউরোপ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি পুনরুদ্ধার করে। 

"ইসলামী স্বর্ণযুগ" শব্দগুচ্ছটি ১৯ শতকের "প্রাচ্যবাদী" আন্দোলনের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের আওতায় পশ্চিমা শিক্ষাবিদরা মধ্যপ্রাচ্য, এশীয় এবং উত্তর আফ্রিকার সমাজ অধ্যয়নে নিযুক্ত ছিলেন। তারা ইউরোপীয় সম্প্রসারণের সময় ইসলামী ভূখণ্ডে কাজ করার সময় কিছু অন্তর্নিহিত অনুমান এবং মনোভাব নিয়ে এসেছিলেন, যা উপনিবেশকারীদের প্রচারিত ধারণার সাথে সম্পর্কিত ছিল। এই ধারণাগুলি বিশেষ করে আমেরিকান-আরব পণ্ডিত এডওয়ার্ড সাইদসহ অনেকের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। সাইদের মতে, এই প্রাচ্যবাদী মনোভাবগুলি ইসলামী সমাজের বাস্তবতার সাথে খুব কম সম্পর্কিত ছিল এবং এটি একটি স্টেরিওটাইপ তৈরি করেছে যা ইসলামী সংস্কৃতি ও সমাজের প্রকৃত চিত্রকে বিকৃত করেছে।

ইসলামের স্বর্ণযুগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, পন্ডিত, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, ভূতত্ত্ববিদ, বণিক এবং পর্যটকরা মানবজাতির ইতিহাসে নিজেদের নাম অমর করে রেখেছেন। কবি ও সাহিত্যিকরা সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে সমাজের চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিজ্ঞানীরা নতুন আবিষ্কার ও গবেষণার মাধ্যমে মানবজাতির জ্ঞানকে বিস্তৃত করেছেন। বণিকরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রসারিত করেছেন, যা অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়তা করেছে। দার্শনিকরা নৈতিকতা ও আইনশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছেন, যা সমাজের নৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।

ইসলামের স্বর্ণযুগের উত্থান

ইসলামী স্বর্ণযুগের বিকাশে তিনটি প্রধান রাজবংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এই তিনটি রাজবংশের অবদান ছাড়া ইসলামী স্বর্ণযুগের বিকাশ সম্ভব ছিল না।

১. উমাইয়া খিলাফত: (৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ)

উমাইয়া সাম্রাজ্য ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা) এর খিলাফত লাভের মাধ্যমে উমাইয়া পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। তবে মুয়াবিয়া (রা), যিনি দীর্ঘদিন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন, তিনিই উমাইয়া বংশের শাসন সূচনা করেন। রাশিদুন খলিফার শাসনামলে  ইসলাম দ্রুত আরব থেকে উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে এবং সময়ের সাথে সাথে দক্ষিণ ইউরোপের আইবেরিয়ান উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 636 খ্রিস্টাব্দে, মুসলিম বাহিনী সিরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এক বছর পরে পারস্যে এসে আধিপত্য বিস্তার করে। সিরিয়া উমাইয়াদের ক্ষমতার ভিত্তি হয়ে উঠে এবং দামেস্ক হয় তাদের রাজধানী। উমাইয়ারা মুসলিমদের বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখে। চার বছর পর, মুসলিম বাহিনী ককেসাস, ট্রান্সঅক্সানিয়া, সিন্ধু, মাগরেব ও ইবেরিয়ান উপদ্বীপ (আন্দালুস) জয় করে মুসলমান বিশ্বের আওতাধীন করে নেয়। সীমার সর্বোচ্চে পৌছালে উমাইয়া খিলাফত মোট ৫.৭৯ মিলিয়ন বর্গ মাইল (১,৫০,০০,০০০ বর্গ কি.মি.) অঞ্চল অধিকার করে রাখে।তখন পর্যন্ত বিশ্বের দেখা সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ ছিল। অস্তিত্বের সময়কালের দিক থেকে এটি ছিল পঞ্চম।

উমাইয়াদের শাসনের প্রতি অসন্তোষ: উমাইয়া সাম্রাজ্যের শাসনের প্রতি অসন্তোষের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল, যা তাদের শাসনকে দুর্বল করে তুলেছিল।  উমাইয়া শাসনকালে আরব এবং অনারব মুসলমানদের মধ্যে বৈষম্য ছিল। অনারব মুসলমানদের প্রতি অবহেলা এবং তাদের অধিকার হ্রাস পাওয়ার কারণে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় নীতির প্রতি অনেক মুসলমানের বিরোধিতা ছিল। তারা ইসলামের মূল নীতিগুলি থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল বলে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান তাদের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। তারা গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচনের পরিবর্তে মনোনয়ন পদ্ধতি চালু করে , অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এই অসন্তোষের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের সূচনা হয়। 

আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বিরোধের কারণে সিরিয়ার বাইরের প্রদেশগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে দ্বিতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধ (৬৮০-৬৯২) এবং বার্বার বিদ্রোহ (৭৪০-৭৪৩) এর সময়। দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের সময়, উমাইয়া গোত্রের নেতৃত্ব সুফয়ানি শাখা থেকে মারওয়ানি শাখায় হস্তান্তরিত হয়।  ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সম্পদ ও লোকবল কমে যায়, যা উমাইয়া খিলাফতের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে আব্বাসীয় বিপ্লব ঘটে, যা উমাইয়া পরিবারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। 

আব্বাসীয় বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন আবু মুসলিম, একজন পারস্য সামরিক নেতা। ৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবুল আব্বাস আল-সাফাহকে শিয়া-অধ্যুষিত কুফা শহরে নিয়ে আসেন। আবুল আব্বাস শীঘ্রই নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। দুই বছর পর, আবু মুসলিম ও আস-সাফাহের সেনাবাহিনী টাইগ্রিস নদীর কাছে জাবের যুদ্ধে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে মারওয়ান পরাজিত ও নিহত হন। আস-সাফাহ দামেস্ক দখল করেন এবং আবদ আল-রহমান ব্যতীত উমাইয়া পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের হত্যা করেন। আবদ আল-রহমান স্পেনে পালিয়ে যান এবং  সেখানে উমাইয়া সাম্রাজ্য (আন্দালুস) প্রতিষ্ঠা করেন। এ খিলাফত ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে থাকে এবং আন্দালুসের ফিতনার পর এর পতন হয়।

২. আব্বাসীয় রাজবংশ: (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ)

আব্বাসীয় খিলাফত ছিল ইসলামি খিলাফতগুলোর মধ্যে তৃতীয় খিলাফত। এই খিলাফত রাসূল (সা.) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের দ্বারা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে কুফায় প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় মারওয়ানের সময় আব্বাসের চতুর্থ বংশধর ইবরাহিম বিরোধিতা শুরু করেন। খোরাসান প্রদেশ ও শিয়া আরবদের কাছ থেকে সমর্থন লাভের মাধ্যমে তিনি বেশ সাফল্য অর্জন করলেও ৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধরা পড়েন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। কারো মতে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর তার ভাই আবদুল্লাহ প্রতিবাদ এগিয়ে নেন। তিনি আবুল আব্বাস আস সাফাহ নামে পরিচিত হন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উমাইয়াদের জাবের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। 

বিজয়ের পর, তিনি মধ্য এশিয়ায় সেনা পাঠান। তার সেনাবাহিনী ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে ট্যাং রাজবংশের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই যুদ্ধে বন্দী চাইনিজদের কাছ থেকে তারা কাগজ তৈরির পদ্ধতি শিখে নেয়। বারমাকিরা, যারা বাগদাদকে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল, তারা বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম কাগজ কলের প্রচলন ঘটায়। দশ বছরের মধ্য আব্বাসীয়রা স্পেনে উমাইয়া রাজধানী কর্ডোবাতে আরেকটি নামকরা কাগজ কল নির্মাণ করে। এরপর, ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী বাগদাদে স্থানান্তরিত করা হয়। 

আব্বাসীয় খেলাফতের সময় খ্রিষ্টান ও হিন্দু পন্ডিতদের অবদান সত্যিই উল্লেখযোগ্য ছিল। এই সময়কালটি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশের একটি সোনালী অধ্যায়। মুসলিম সাম্রাজ্য বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে নতুন নতুন অঞ্চল দখল করে। এই অঞ্চলে স্থানীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা শুরু হয়। বিভিন্ন ভাষার জ্ঞান ধীরে ধীরে আরবি ভাষায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে এই জ্ঞান অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়। সিরিয়াক ও ভারতীয় পন্ডিতরা তাদের দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক কাজগুলো আরবিতে অনুবাদে সাহায্য করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, আল-কিন্দি, যিনি ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতিকে মুসলিম ও খ্রিস্টান বিশ্বে পরিচিত করেন। খ্রিষ্টান ও হিন্দু পন্ডিতদের গবেষণা ও চিন্তাভাবনা মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাজকে সমৃদ্ধ করে। তারা গ্রীক, ভারতীয় এবং সিরিয়াক দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করেছেন। এই সহযোগিতার ফলে মুসলিম সভ্যতা বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে। নিজেদের পরিবার-পরিজন নিয়ে যাতে দুশ্চিন্তা করা না লাগে সেজন্য এসব কাজে নিয়োজিতদের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, স্থাপন করা হয়েছিলো হাউজ অফ উইজডমের মতো লাইব্রেরি, অনুবাদ কেন্দ্র ও একাডেমি। এইভাবে, আব্বাসীয় শাসনামলে একটি নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ ঘটে। 

পারস্যে ১৫০ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করার পর, খলিফাকে প্রধান কর্তৃপক্ষ হিসেবে মেনে নিয়ে স্থানীয় আমিরদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। এছাড়াও, খিলাফতটি তার পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ আন্দালুস, মাগরেব ও ইফ্রিকিয়া যথাক্রমে একজন উমাইয়া যুবরাজ, আগলাবি ও ফাতেমীয় খিলাফতের কাছে হারাতে হয়।

মঙ্গোল নেতা হালাকু খান ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদ দখল করার পর আব্বাসীয় খিলাফত বিলুপ্ত হয়। এরপর, তারা মামলুক শাসিত মিশরে অবস্থান করে এবং ১৫১৭ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যাপারে কর্তৃত্ব দাবি করতে থাকে। যদিও রাজনৈতিক ক্ষমতার অভাব ছিল (কায়রোর খলিফা আল-মুস্তাইনের সংক্ষিপ্ত ব্যতিক্রম ছাড়া)

ফাতেমীয় খিলাফত (৯০৯–১১৭১)

ফাতেমীয় খিলাফত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসমাইলি শিয়া খিলাফতীয় রাষ্ট্র, যা ১০ম থেকে ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। ফাতেমীয়রা আরব বংশোদ্ভূত একটি রাজবংশ, যারা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কন্যা ফাতিমা (রা.) এবং তার স্বামী হজরত আলী ইবনে আবি তালিব এর সাথে তাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কিত করে।ফাতেমীয় খিলাফত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসমাইলি শিয়া খিলাফত, যা লোহিত সাগর থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর আফ্রিকার এলাকা শাসন করত। এই খিলাফতটি তিউনিসিয়াকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মিসরকে তাদের রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। তাদের শাসনামলে, খিলাফতটি উন্নতির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়  এর অধীনে মাগরেব, সুদান, সিসিলি, লেভান্ট ও হেজাজ শাসিত হয়।

৩. উমাইয়া রাজবংশ (আন্দালুস): (৭৫৬-১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ)

উমাইয়া রাজবংশ (আন্দালুস) ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা ৭৫৬ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই সময়কালে উমাইয়া রাজবংশ আন্দালুসে (বর্তমান স্পেনের একটি অঞ্চল) শাসন করেছিল। এখানে কিছু মূল পয়েন্ট তুলে ধরা হলো:

উমাইয়া খিলাফত: উমাইয়া রাজবংশ ইসলামের দ্বিতীয় খিলাফত হিসেবে পরিচিত। এটি প্রথমে দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে আন্দালুসে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

আন্দালুসের ইতিহাস: ৭১১ সালে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসে প্রবেশ করে এবং ৭৫৬ সালে উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠা ঘটে। এই সময়কালে আন্দালুসে ইসলামী সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও শিল্পের বিকাশ ঘটে।

শাসনকাল: উমাইয়া রাজবংশের শাসনকাল ছিল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সময়। তারা বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করে।

পতন: ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে উমাইয়া রাজবংশের শাসন শেষ হয়, যা স্পেনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।


🔆 সমাজ ব্যবস্থা

তৎকালীন ইসলামী সমাজব্যবস্থা ছিল একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক কাঠামো, যা ধর্ম, নৈতিকতা এবং সামাজিক নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এই সমাজব্যবস্থার কিছু মূল বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:

স্বাস্থ্যসেবা 

এই শতাব্দীতেই সর্বপ্রথম ডাক্তারদের যোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য যোগ্যতার সনদপত্র দেখিয়ে কাজে যোগ দেয়ার প্রচলন শুরু হয়। যা রোগীদের সুরক্ষা এবং চিকিৎসার মান উন্নত করতে সহায়ক ছিলহাসপাতালগুলো পরিচালনা করতে একটি তিন সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড গঠন করা হতো। নবম শতকে মুসলিম বিশ্বের অনেক শহরেই ওষুধের দোকান চালু হয়ে গিয়েছিলো। শুরুতে অবশ্য তাদের জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম ছিলো না। পরবর্তীতে খলিফা আল মামুন এবং আল মু'তাসিম ফার্মাসিস্টদের জন্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন যা ঔষধের মান এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।

ফার্মেসির শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক ছিল। এই প্রশিক্ষণ ফার্মাসিস্টদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের ঔষধ ব্যবস্থাপনা এবং রোগীর সেবায় দক্ষতা বৃদ্ধি করে। ডাক্তারদের ফার্মেসি খোলার বা ফার্মেসিতে অর্থ বিনিয়োগের অনুমতি না দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এটি নিশ্চিত করেছিল যে ফার্মেসি পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি না ঘটে। ফার্মেসিগুলোর মান নিয়মিতভাবে যাচাই করার জন্য সরকারি পরীক্ষকরা নিয়োজিত ছিলেন। এই প্রক্রিয়া ফার্মেসির মান এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়ক ছিল।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মিশরে প্রতিষ্ঠিত  কালাউন হাসপাতাল
আগে হাসপাতালগুলো রাতের বেলায় বন্ধ হয়ে যেত। দশম শতাব্দী থেকে ২৪ ঘন্টাই সেগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। দরিদ্র কাউকে যাতে অর্থের অভাবে ফিরে যেতে না হয় সেই ব্যাপারটাও নিশ্চিত করা হয়েছিলো, গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা। উদাহরণস্বরুপ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মিশরে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক কালাউন হাসপাতাল যা চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক ছিল। ধনী-গরীব, সবল-দুর্বল, স্থানীয় কিংবা দূর থেকে আগত, চাকুরে-বেকার নির্বিশেষে সবাই সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পেত।

শিক্ষা ব্যবস্থা

আল-কারাওউইন বিশ্ববিদ্যালয় ৯৭০
শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে আল-কারাওউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম যা মরক্কোর ফেজ শহরে ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো এবং ক্রমাগত শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়।এরপর মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৯৭০ (মতান্তরে ৯৭২) খ্রিষ্টাব্দে। এটি প্রথমে একটি মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করে, পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেয়া হয়। ফাতিমীয় খেলাফতের সময় শিক্ষাব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। খলিফারা পণ্ডিতদের বিশেষ সমাদর করতেন, তাদেরকে সভায় গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হতো, শিক্ষার্থীদেরকে জ্ঞানার্জনের জন্য উৎসাহ দেয়া হতো। সেই সাথে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জ্ঞানার্জনের পথ সুগম করতে গড়ে তোলা হয়েছিলো বিভিন্ন লাইব্রেরী। উদাহরণ হিসেবে ত্রিপলির লাইব্রেরী ছিলো একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, যেখানে প্রায় ৩০,০০,০০০ বই ছিল। এটি সত্যিই দুঃখজনক যে ক্রুসেডের সময় এই মূল্যবান সম্পদগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। 
ত্রিপলির লাইব্রেরী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক লাইব্রেরীগুলোতে যে ধরনের চিন্তা-ভাবনার বিনিময় হতো, তা আজকের পাবলিক লাইব্রেরীর ধারণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই লাইব্রেরীগুলোতে বিভিন্ন পণ্ডিত এবং শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে নতুন নতুন ধারণা এবং জ্ঞান বিনিময় করতেন, যা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া, লাইব্রেরীগুলোতে পণ্ডিতদের জন্য থাকার ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ডিং স্কুলের ব্যবস্থা ছিল, যা শিক্ষার প্রসারে সহায়ক ছিল। এই ধরনের ব্যবস্থা আজকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। 
শিক্ষার কথা যখন উঠলো, তাহলে পলিম্যাথদের কথা না বললেই নয়। পলিম্যাথ বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তিকে, যিনি বিভিন্ন জ্ঞানের শাখায় দক্ষ এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। স্বর্ণযুগের মুসলিম পলিম্যাথদের মাঝে রয়েছেন - আল-বিরুনী - ইতিহাসবিদ, গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আল-জাহিজ - সাহিত্যিক এবং জীববিজ্ঞানী, যিনি প্রাণীজগতের উপর গবেষণা করেছেন। আল-কিন্দী - দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ, যিনি বিভিন্ন শাস্ত্রে অবদান রেখেছেন। ইবন সিনা (Avicenna) - চিকিৎসা এবং দার্শনিক, যিনি "ক্যানন অফ মেডিসিন" রচনা করেছেন। আল-ইদ্রিসী - ভূগোলবিদ, যিনি মানচিত্র তৈরি করেছেন। ইবন বাজ্জাহ - দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। ইবন জুহ্‌র - চিকিৎসক এবং দার্শনিক। ইবন তুফাইল - দার্শনিক এবং লেখক। ইবন রুশ্‌দ (Averroes) - দার্শনিক, যিনি আরিস্টটলের কাজের ব্যাখ্যা করেছেন। আল-সুয়ূতী - ইতিহাসবিদ এবং ইসলামি পণ্ডিত। জাবির ইবন হাইয়ান - রসায়নবিদ, যিনি রসায়নের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। আব্বাস ইবন ফিরনাস - বিজ্ঞানী এবং আবিষ্কারক, যিনি প্রথম বিমান উড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।ইবন আল-হাইথাম (Alhazen) - আলোকবিজ্ঞানী, যিনি দৃষ্টির তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। ইবন আল-নাফিস - চিকিৎসক, যিনি রক্ত সঞ্চালনের তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। ইবন খালদুন - ইতিহাসবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানী, যিনি ইতিহাসের উপর মৌলিক কাজ করেছেন। আল-খারিজ্‌মী - গণিতজ্ঞ, যিনি অ্যালজেব্রার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। আল-মাসুদী - ইতিহাসবিদ এবং ভ্রমণকারী। আল-মুকাদ্দাসী - ভূগোলবিদ এবং মানচিত্র প্রস্তুতকারী। নাসির আল-দীন আল-তুসী - জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক।
এই পলিম্যাথরা তাদের বিভিন্ন গবেষণা এবং আবিষ্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের কাজ আজও আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে চলেছে।

অর্থনীতি

সেই যুগে ইসলামী সভ্যতার বাণিজ্যিক অবকাঠামো অনেক বিস্তৃত ছিলো এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চোখে পড়ার মতো।আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর এবং ভারতীয় মহাসাগর থেকে চীনা সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো বাণিজ্যিক যোগাযোগ। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য যেমন মসলা, কাপড়, এবং মূল্যবান ধাতু আদান-প্রদান হতো। ইসলামী খিলাফতের সময়ে নৌবাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।সমুদ্রপথে বাণিজ্য করার ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও জ্ঞানের আদান-প্রদান ঘটেছিল। বাগদাদ, কায়রো, এবং কর্ডোবা মতো শহরগুলো বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। এই শহরগুলোতে বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।

কৃষি ব্যবস্থা 

এই সময়কালকে ‘আরবের কৃষি বিপ্লব’ বলা হয়, কারণ এটি কৃষির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এবং উন্নতির সূচনা করেছিল। মুসলিম গবেষকরা বিভিন্ন দেশের কৃষি প্রযুক্তি এবং পদ্ধতি গ্রহণ করে সেগুলোকে উন্নত করেছিলেন। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে সেচ ব্যবস্থা, ফসলের ঘূর্ণন এবং নতুন জাতের শস্যের চাষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারত, আফ্রিকা, চীন ইত্যাদি দেশ থেকে খাদ্যশস্য এনে ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শস্য যেমন ধান, গম, ফলমূল এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছিল। ব্যবসায়িক চাহিদার ভিত্তিতে অর্থকরী ফসল যেমন তুলা, আখ এবং মসলা উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে কাজ করা হয়েছিল। এই ফসলগুলো বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হতো, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করেছিল। এই সবকিছু মিলিয়ে ইসলামের স্বর্ণযুগে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

শিল্প, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নতি

এই সময়কালকে মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে বিভিন্ন উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছিল তখনকার বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় পানি এবং বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগানো শুরু হয়েছিল। 

সপ্তম শতাব্দী থেকে জীবাশ্ম জ্বালানীর সীমিত ব্যবহার এবং ওয়াটার মিলের ব্যবহার শুরু হয়। উল্লেখযোগ্য মিলগুলোর মধ্যে ছিল: ফুলিং মিল, গ্রিস্ট মিল, রাইস হালার, শিপ মিল, স্ট্যাম্প মিল, স্টিল মিল, সুগার মিল। মুসলিম প্রকৌশলীরা ক্র্যাঙ্ক শ্যাফট এবং ওয়াটার টার্বাইন উদ্ভাবন করেছিলেন। তারা মিলে গিয়ার লাগানোর ব্যবস্থা এবং পানি উত্তোলনের যান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। 

তখনকার শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদিত কিছু উল্লেখযোগ্য পণ্য যেমনজ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত জিনিসপত্র, সিরামিক দ্রব্যাদি, রাসায়নিক পদার্থ, পাতন প্রযুক্তি, ঘড়ি ও গ্লাস, জলশক্তি ও বায়ুশক্তি চালিত যন্ত্র, কাগজ, মোজাইক, পারফিউম, পেট্রোলিয়াম, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, সিল্ক, চিনি, বস্ত্র, অস্ত্র নির্মাণ । 

শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, সঙ্গীত, এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন শাখায় মুসলিম সমাজ অসাধারণ উন্নতির স্বাক্ষর রেখেছিল। শাসন ব্যবস্থার উন্নতি এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যও এই সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সবকিছু মিলিয়ে, ইসলামের স্বর্ণযুগে প্রযুক্তি এবং শিল্পের উন্নতি মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

স্থাপত্য

মুসলিম স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শনগুলো সত্যিই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই স্থাপনাগুলো শুধুমাত্র ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে না, বরং শিল্প, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে কিছু উল্লেখযোগ্য মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনের তালিকা দেওয়া হলো:


গ্রেট মস্ক অফ কাইরোওয়ান (তিউনিশিয়া) 

গ্রেট মস্ক অফ কাইরোওয়ান (আরবি: جامع القيروان الأكبر) তিউনিশিয়ার কাইরোওয়ান শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ।  মসজিদটি ৬৭০ সালে আরব সেনানায়ক  উকবা ইবনে নাফি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। কাইরোওয়ান মসজিদ ইসলামের প্রথম যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি এবং এটি ইসলামের বিস্তারের জন্য একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। মসজিদটির স্থাপত্য শৈলী ইসলামী স্থাপত্যের একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে বিশাল গম্বুজ, সুন্দর মিনার এবং প্রশস্ত প্রাঙ্গণ রয়েছে।  কাইরোওয়ান শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং এটি তিউনিশিয়ার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি প্রতি বছর অনেক পর্যটক এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আকর্ষণ করে।

গ্রেট মস্ক অফ সামারা (ইরাক) 

গ্রেট মস্ক অফ সামারা ৮৫১ খ্রিস্টাব্দ
গ্রেট মস্ক অফ সামারা (আরবি: جامع المتوكلية) ইরাকের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, যা এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম মসজিদ ছিল। এটি ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল দ্বারা নির্মিত হয়। মসজিদটি ইরাকের সামারা শহরে, বাগদাদ থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে, টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত। মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ হল এর ৫২ মিটার লম্বা পেঁচানো মিনার, যা "মালওয়িয়া" নামে পরিচিত। এটি ইসলামী স্থাপত্যের একটি অসাধারণ উদাহরণ, যেখানে ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক উপাদানের মিশ্রণ দেখা যায়। মসজিদটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এবং এটি ইসলামী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রেট মস্ক অফ সামারা আজও পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান, যেখানে ইতিহাস এবং স্থাপত্যের সমন্বয় দেখা যায়

আল-আজহার মসজিদ (Al-Azhar Mosque)

আল-আজহার মসজিদ (আরবি: الجامع الأزهر) ইসলামী জগতের সবচেয়ে পুরনো এবং বিখ্যাত মসজিদগুলির মধ্যে একটি। ৯৭০ সালে মিশরের কায়রো শহরে মসজিদটি ফাতিমি খলিফা আল-মু'ইজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে প্রার্থনা এবং শিক্ষার স্থান হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি ইসলামী শিক্ষার বিকাশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে এবং মিশরে ট্রান্সেপ্টযুক্ত মসজিদের প্রথম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। মসজিদটিতে স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে, যার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী উপাদান এবং ফাতিমি প্রভাব রয়েছে। আল-আজহার তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিখ্যাত, যা বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি। এটি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইন এবং অন্যান্য বিষয় অধ্যয়নের জন্য আকর্ষণ করে। আল-আজহার মসজিদ ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে অব্যাহত রয়েছে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে।

আলহাম্বরা প্যালেস (স্পেন)

আলহাম্বরা প্যালেস (Alhambra) হলো একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ এবং দুর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ কমপ্লেক্স, যা স্পেনের গ্রানাডা শহরে অবস্থিত। এটি ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম বিখ্যাত নিদর্শন এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত প্রাসাদগুলোর মধ্যে একটি।মূলত আলহাম্বরা নির্মিত হয়েছিল ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ সালের মধ্যে, মুসলিম শাসক ইবন আল-আহমার এর শাসনকালে। এটি মুসলিম এবং খ্রিস্টান উভয় সংস্কৃতির প্রভাবকে ধারণ করে। আলহাম্বরা তার অসাধারণ স্থাপত্য, জটিল খোদাই এবং সুন্দর বাগানের জন্য বিখ্যাত। এর মধ্যে রয়েছে নাসরিদ প্রাসাদ, চার্লস প্যালেস, এবং জেনারেলিফে বাগান। আলহাম্বরা প্যালেসের সৌন্দর্য এবং ইতিহাসের জন্য এটি একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটককে আকর্ষণ করে। 

আল হাকিম মসজিদ (মিসর)

আল হাকিম মসজিদ (Al-Hakim Mosque), যা আল-আনওয়ার নামেও পরিচিত, মিসরের কায়রো শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।মসজিদটির নির্মাণ শুরু হয় ৯৯০ খ্রিস্টাব্দে, খলিফা আল-আজিজ এর সময়। এটি পরে খলিফা আল-হাকিম বি-আমর আল্লাহ এর নামে নামকরণ করা হয়, যিনি ষষ্ঠ ফাতেমীয় খলিফা ছিলেন। মসজিদটি তার বিশাল আকার, জটিল খোদাই এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। এর অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের ডিজাইন দর্শকদের আকর্ষণ করে। মসজিদটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই। আল হাকিম মসজিদ তার ইতিহাস এবং স্থাপত্যের জন্য একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করে। 

গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান (চীন)

গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান (Great Mosque of Xi'an) চীনের একটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। এটি জিয়ান শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং এটি চীনের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম মসজিদগুলোর মধ্যে একটি। মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ৭৪২ খ্রিস্টাব্দে, যা ইসলামের প্রথম শতাব্দীর সময়কাল। গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান ইসলামী এবং চীনা স্থাপত্যের একটি অনন্য সংমিশ্রণ। এর নির্মাণশৈলী এবং ডিজাইন চীনা ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের প্রভাবকে প্রতিফলিত করে। মসজিদটির মধ্যে রয়েছে সুন্দর বাগান, প্যাভিলিয়ন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা। গ্রেট মস্ক অফ জিয়ান তার ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের জন্য একটি বিশেষ স্থান, যা প্রতিদিন অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করে। 

এই স্থাপনাগুলো শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মের এক অনন্য মেলবন্ধন। এগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মুসলিম স্থপতিরা তাদের সময়ে কতটা অসাধারণ কাজ করেছেন।

🔆 স্বর্ণযুগের পরিসমাপ্তি

আস্তে আস্তে একসময় বিবর্ণ হতে শুরু করে মুসলিমদের গৌরবমাখা সেই স্বর্ণযুগ। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের পর শুরু হওয়া ক্রুসেড ক্রমেই অস্থিতিশীল করে তোলে গোটা মুসলিম বিশ্বকে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ছিল খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ, যা প্রায় ৩০০ বছর ধরে চলেছিল। এই যুদ্ধগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের কাছ থেকে জেরুসালেম শহর পুনরুদ্ধার করা। প্রথম ক্রুসেডের সফলতার পর, খ্রিষ্টানরা জেরুসালেমে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। 





পরবর্তী ক্রুসেডগুলোতে মুসলমানরা ধীরে ধীরে তাদের অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডের ফলে ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে।এটি ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এর অল্প কিছুদিন পরেই তের শতকে ভেতরে ধুঁকতে থাকা মুসলিম বিশ্বের সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক ত্রাস- মঙ্গোলদের আক্রমণ। 

১২০৬ সালে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে শক্তিশালী মঙ্গোল সাম্রাজ্য, যা মধ্য এশিয়ায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।১২৫৮ সালের ২৯ জানুয়ারি হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী ও তার মিত্র শক্তিদের সামনে তছনছ হয়ে যায় আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী, তখনকার দিনের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদ। ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেরদিন চলা সেই অভিযানে মঙ্গোল বাহিনীতে ছিলো ১,২০,০০০-১,৫০,০০০ সেনা। অপরপক্ষে আব্বাসীয় খেলাফতের সেনাসংখ্যা ছিলো সেই তুলনায় বেশ কম, ৫০,০০০ প্রায়। যুদ্ধে মুসলিমরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মঙ্গোল বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা না গেলেও সেটা ছিলো খুবই নগণ্য। অন্যদিকে আব্বাসীয়দের পক্ষে থাকা সকল সেনাই সেই অভিযানে নিহত হয়েছিলেন। পাশ্চাত্য সূত্রানুযায়ী সেই যুদ্ধে প্রায় ২,০০,০০০-৮,০০,০০০ সাধারণ নাগরিক মারা গিয়েছিলেন। অপরদিকে আরব বিশ্বের মতে এ সংখ্যাটি ২০,০০,০০০ প্রায়।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, মঙ্গোলদের এ আক্রমণই ছিলো ইসলামের সোনালী যুগকে ইতিহাসের অধ্যায়ে পরিণত করার মূল নিয়ামক। কালক্রমে একসময় অটোম্যান সাম্রাজ্য উঠে দাঁড়ালেও ইসলামের সোনালী সেই যুগ আর কখনোই ফিরে আসে নি, বরং সোনালী সেই সূর্য কালে কালে অস্তমিতই হয়েছে।