February 08, 2025

ভুলে যাওয়ার রোগ ডিমেনশিয়া: আপনার প্রিয়জনকে রক্ষা করুন।

 ডিমেনশিয়া

ডিমেনশিয়া হলো মস্তিষ্কের একটি ক্ষয়জনিত রোগ যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, স্মৃতিশক্তি এবং ব্যক্তিত্বের ধরন পরিবর্তন করে। সাধারণত ৬৫ বছর বয়সের পর ডিমেনশিয়া সমস্যাটি শুরু হয়। ডিমেনশিয়ার বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যার মধ্যে আলঝেইমার্স ডিজিজ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। আলঝেইমার্স ডিজিজে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রোটিন জমা হয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু প্লাক বসে। এর ফলে মানুষের চিন্তার ক্ষমতা, আচরণ, ব্যক্তিত্ব এবং ভুলে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। 

ডিমেনশিয়ার কারণ

ডিমেনশিয়ার সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে কিছু ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। চলুন, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির কারণগুলোকে একটু বিস্তারিতভাবে দেখি:

  • পারিবারিক ইতিহাস: যদি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ডিমেনশিয়া থাকে, তবে আপনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • উচ্চ রক্তচাপ: এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
  • ধূমপান: ধূমপান মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
  • অতিরিক্ত মদ্যপান: এটি মস্তিষ্কের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
  • থাইরয়েডের সমস্যা: থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে।
  • বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের অভাব: যারা নিয়মিত মানসিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন না, তাদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বেশি।

ডিমেনশিয়ার লক্ষণ

ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলি সাধারণত ধীরে ধীরে বিকাশ ঘটে এবং বিভিন্ন ধরনের ডিমেনশিয়ার উপর নির্ভর করে। এখানে কিছু সাধারণ লক্ষণ উল্লেখ করা হলো:

  • স্মৃতিশক্তির হ্রাস: বিশেষ করে সাম্প্রতিক ঘটনার স্মৃতি হারানো।
  • চিন্তাভাবনার সমস্যা: সিদ্ধান্ত নেওয়া বা পরিকল্পনা করতে অসুবিধা হওয়া।
  • ভাষাগত সমস্যা: কথোপকথনে শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হওয়া।
  • অভিযোজনের সমস্যা: পরিচিত পরিবেশে হারিয়ে যাওয়া বা পথ ভুলে যাওয়া।
  • আচরণগত পরিবর্তন: মেজাজের পরিবর্তন, উদ্বেগ বা হতাশা অনুভব করা।
  • সামাজিক কার্যকলাপে আগ্রহের অভাব: আগের মতো সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ না করা।
  • দৈনন্দিন কাজকর্মে অসুবিধা: সাধারণ কাজ যেমন রান্না বা গৃহকর্মে সমস্যা হওয়া।

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের জন্য কিছু কার্যকরী উপায় রয়েছে, যা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো:

  • স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন, যা ফল, সবজি, শস্য এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ।
  • শারীরিক কার্যকলাপ: নিয়মিত ব্যায়াম করুন। এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমায়।
  • মানসিক চ্যালেঞ্জ: পাজল, বই পড়া, নতুন কিছু শেখা ইত্যাদি মানসিক কার্যকলাপ করুন। এটি মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।
  • সামাজিক সংযোগ: পরিবার ও বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করুন।
  • ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
  • রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা সাধারণত একাধিক পদ্ধতির সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো:

ওষুধ: ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলি পরিচালনা করতে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ব্যবহৃত কিছু ওষুধ হলো:

  • ডনপেজিল
  • রিভাস্টিগমাইন
  • গ্যালান্টামাইন
  • মেম্যান্টাইন

এই ওষুধগুলি স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তাভাবনার উন্নতি করতে সহায়তা করে।

জীবনধারা পরিবর্তন:

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার প্রভাব কমানো সম্ভব।

ভিটামিন ডি এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উপকারী হতে পারে।

থেরাপি:

  • কগনিটিভ থেরাপি: এটি রোগীর চিন্তাভাবনা এবং আচরণকে উন্নত করতে সহায়তা করে।
  • সামাজিক থেরাপি: সামাজিক সংযোগ এবং কার্যকলাপের মাধ্যমে রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করা যায়।

পরিবারের সহায়তা:

রোগীর পরিবারের সদস্যদের সহায়তা এবং শিক্ষা প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন কার্যকলাপের জন্য সহায়ক হতে পারে।

নিয়মিত চিকিৎসা পর্যালোচনা:

একজন ডিমেনশিয়া বিশেষজ্ঞের সাথে নিয়মিত পরামর্শ করা উচিত, যাতে চিকিৎসার কার্যকারিতা এবং রোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যায়।

ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, এবং এটি রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। 


February 03, 2025

টেনিস এলবো: কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি

টেনিস এলবো  কি?

টেনিস এলবো, যা ল্যাটারাল এপিকন্ডাইলাইটিস (Lateral Epicondylitis) হিসেবেও পরিচিত, এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে কনুইয়ের বাইরের অংশে ব্যথা ও অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই অবস্থাটি সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। হাতের শক্তি কমে যেতে পারে, বিশেষ করে জোরে কিছু টানার সময়। ব্যথা মাঝে মাঝে হাতের পিছনে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কেনো এটাকে টেনিস এলবো বলে?

টেনিস এলবো কথার উৎপত্তি মূলত টেনিস প্লেয়ারদের উপর ভিত্তি করে। টেনিস খেলার সময় খেলোয়াড়রা অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে কনুইতে ব্যথা অনুভব করতেন। এ কারণে, এই রোগটির নামকরণ করা হয়েছে "টেনিস এলবো"। 

কেনো এটাকে Lateral Epicondylitis বলা হয়?

আমাদের হিউমেরাস নামে পরিচিত হাড়টির শেষ অংশে রয়েছে Lateral Epicondyl। এই Epicondyl-এর উপরে যে মাংসপেশী এবং টেনডন রয়েছে, সেই টেনডনটি ফুলে যায়। এই কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নামকরণ করা হয়েছে Lateral Epicondylitis।

কারা বেশি আক্রান্ত হয়?

  • ক্রীড়া: যারা টেনিস, ব্যাডমিন্টন, গল্ফ খেলেন তাদের এটি সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে
  • পেশা: হাতুড়ি ও স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে যারা কাজ করে থাকেন, পেইন্টিং, টাইপিং, স্টেনোগ্রাফি, কাঠ কাটা কাজের জন্যও হাতে অতিরিক্ত প্রেসার পড়ায় টেনিস এলবো হতে পারে। মহিলারা যারা খুব বেশি রান্নাবান্নাতে ব্যস্ত থাকেন।
  • অন্যান্য: মোটরসাইকেল চালানো, বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস যেমন- রিউমাটয়েড, গাউট ও ডায়াবেটিসের রোগীদের টেনিস এলবো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কেন হয় Tennis Elbow?

দীর্ঘদিন ধরে হাতের প্রচুর পরিশ্রম করলে বা বিভিন্ন রোগে ভুগলে (যেমন ডায়াবেটিস, থাইরয়েড) হাতের মাংসপেশীগুলোতে বারবার চাপ পড়ার ফলে মাংসপেশীর কিছু ফাইবার এবং টেনডন নষ্ট হয়ে যায়। এই নষ্ট হওয়া মাংসপেশী ও টেনডন কাজ করার সময় কনুইতে অতিরিক্ত চাপ পড়ায় এবং প্রচন্ড ব্যথা দেয়। এমনকি কাজ করতেও অসুবিধা হতে পারে।

উপসর্গঃ যে কাজ বারবার করতে হয়, এমন কাজেই মূলত এ রোগ ধরা পড়ে বেশি। যেমন-

  • ভেজা কাপড় নিংড়ানো, ভারী কিছু তোলা বা রুটি বেলার মতো কাজের সময় কনুই থেকে বাহুর অংশে ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ধরনের কাজগুলোতে কনুইয়ের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
  • সারা দিন এক ভঙ্গিমায় মাউস ধরে কাজ করার সময়ও এই ব্যথা অনুভূত হতে পারে। দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে কাজ করা কনুইয়ের জন্য ক্ষতিকর।
  • হাতের কনুইয়ে ব্যথা অনুভব হলে হাত দিয়ে কোনো কিছু তুলতে সমস্যা হয়। এই ব্যথা হাতের নড়াচড়া বা কাজকর্মে আরও বেড়ে যায়।
  • এই ব্যথা কেবল কনুইতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি কনুই থেকে শুরু হয়ে হাতের আঙুল পর্যন্ত যেতে পারে, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
  • এমনকি অপরজনের সাথে করমর্দন (handshake) করার সময়ও এই ব্যথা অনুভূত হতে পারে, যা সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে।

কি করে বুঝবেন যে আপনার Tennis Elbow হয়েছে কিনা?

টেনিস এলবো বা Lateral Epicondylitis শনাক্ত করার জন্য দুটি সহজ টেস্ট আছে:

১. চাপ পরীক্ষা: কনুইয়ের বাইরের দিকের জাংশন পয়েন্টে (যেখানে কনুই শেষ হচ্ছে এবং নিম্নবাহু শুরু হচ্ছে) আলতো করে চাপ দিলে যদি প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয়, তাহলে টেনিস এলবো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

২. কব্জি তোলার টেস্ট: হাতকে L আকৃতিতে করে কব্জিটাকে উপরের দিকে তোলার চেষ্টা করলে যদি কনুইতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয় এবং কব্জিটাকে উপরে তোলা থেকে আটকায়, তাহলেও টেনিস এলবো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অন্যান্য পরীক্ষা:

  • এক্স-রে: এক্স-রে টেনিস এলবো শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে না, কিন্তু অন্যান্য সমস্যা যেমন হাড়ের ভাঙা ইত্যাদি শনাক্ত করতে পারে।
  • রক্ত পরীক্ষা: শর্করা, সিরাম ইউরিক এসিড, আরএ ফ্যাক্টর ইত্যাদি পরীক্ষা করলে টেনিস এলবোর কারণ অন্য কোনো রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, থাইরয়েড) হলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
  • আল্ট্রাসাউন্ড: কনুইয়ের বিশেষ ধরনের আল্ট্রাসাউন্ড টেনিস এলবো শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
  • এমআরআই: এমআরআই টেনিস এলবোর কারণ এবং মাংসপেশী ও টেনডন ক্ষতির বিস্তার শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

Tennis Elbow হলে কি করবেন?

টেনিস এলবোর জন্য ভালো খবর হলো এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৩-৪ মাস বা ৬ মাসের মধ্যে নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায়।

এই সময়কালে কিছু বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ:

  • বিশ্রাম: কনুইকে যথাসম্ভব বিশ্রাম দিন। মোটরবাইক চালানো, কম্পিউটারের মাউস ধরে একটানা কাজ করা এড়িয়ে চলুন। তবে অতিরিক্ত বিশ্রামের কারণে কনুই স্টিফ হতে পারে, তাই নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন।
  • বরফ/গরম সেঁক: প্রদাহ, ফোলা ও ব্যথা কমাতে বরফ বা গরম সেঁক দিতে পারেন।
  • ব্যায়াম: কনুইয়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া ও পেশি শক্তিশালী করার জন্য ব্যায়াম করা উচিত। ব্যথা ও ফোলা কমে গেলে হালকা ব্যায়াম শুরু করুন।
  • খাবার: উচ্চ প্রোটিন এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার (যেমন লেবু, আমলকি) খান।
  • ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ: যদি ৬ মাসের মধ্যে ব্যথা না কমে, তাহলে অবশ্যই একজন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

টেনিস এলবোর চিকিৎসা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কনজারভেটিভ (অস্ত্রোপচার ছাড়া) পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। তবে দুঃখের বিষয়, এই রোগ সেরে যাওয়ার কিছুদিন পর আবার দেখা দিতে পারে। অনেক সময় কনুইয়ের বাইরের দিকে ব্যথা না হয়ে যখন কনুইয়ের ভেতরের পাশে ব্যথা হয়, তাকে গলফার্স এলবো বলে, যার চিকিৎসাও টেনিস এলবোর মতোই।

সতর্কতা:

ইন্টারনেটের তথ্য অনুযায়ী নিজের বা অন্য কারো চিকিৎসা করার চেষ্টা কখনই করবেন না। এগুলো পড়বেন নিজের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার জন্য যাতে ডাক্তারকে আপনার সমস্যাটি জানাতে ও ডাক্তারের পরামর্শ সহজে বুঝতে পারেন আপনি সর্ব অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন।