February 03, 2025

টেনিস এলবো: কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি

টেনিস এলবো  কি?

টেনিস এলবো, যা ল্যাটারাল এপিকন্ডাইলাইটিস (Lateral Epicondylitis) হিসেবেও পরিচিত, এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে কনুইয়ের বাইরের অংশে ব্যথা ও অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই অবস্থাটি সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। হাতের শক্তি কমে যেতে পারে, বিশেষ করে জোরে কিছু টানার সময়। ব্যথা মাঝে মাঝে হাতের পিছনে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কেনো এটাকে টেনিস এলবো বলে?

টেনিস এলবো কথার উৎপত্তি মূলত টেনিস প্লেয়ারদের উপর ভিত্তি করে। টেনিস খেলার সময় খেলোয়াড়রা অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে কনুইতে ব্যথা অনুভব করতেন। এ কারণে, এই রোগটির নামকরণ করা হয়েছে "টেনিস এলবো"। 

কেনো এটাকে Lateral Epicondylitis বলা হয়?

আমাদের হিউমেরাস নামে পরিচিত হাড়টির শেষ অংশে রয়েছে Lateral Epicondyl। এই Epicondyl-এর উপরে যে মাংসপেশী এবং টেনডন রয়েছে, সেই টেনডনটি ফুলে যায়। এই কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নামকরণ করা হয়েছে Lateral Epicondylitis।

কারা বেশি আক্রান্ত হয়?

  • ক্রীড়া: যারা টেনিস, ব্যাডমিন্টন, গল্ফ খেলেন তাদের এটি সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে
  • পেশা: হাতুড়ি ও স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে যারা কাজ করে থাকেন, পেইন্টিং, টাইপিং, স্টেনোগ্রাফি, কাঠ কাটা কাজের জন্যও হাতে অতিরিক্ত প্রেসার পড়ায় টেনিস এলবো হতে পারে। মহিলারা যারা খুব বেশি রান্নাবান্নাতে ব্যস্ত থাকেন।
  • অন্যান্য: মোটরসাইকেল চালানো, বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস যেমন- রিউমাটয়েড, গাউট ও ডায়াবেটিসের রোগীদের টেনিস এলবো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কেন হয় Tennis Elbow?

দীর্ঘদিন ধরে হাতের প্রচুর পরিশ্রম করলে বা বিভিন্ন রোগে ভুগলে (যেমন ডায়াবেটিস, থাইরয়েড) হাতের মাংসপেশীগুলোতে বারবার চাপ পড়ার ফলে মাংসপেশীর কিছু ফাইবার এবং টেনডন নষ্ট হয়ে যায়। এই নষ্ট হওয়া মাংসপেশী ও টেনডন কাজ করার সময় কনুইতে অতিরিক্ত চাপ পড়ায় এবং প্রচন্ড ব্যথা দেয়। এমনকি কাজ করতেও অসুবিধা হতে পারে।

উপসর্গঃ যে কাজ বারবার করতে হয়, এমন কাজেই মূলত এ রোগ ধরা পড়ে বেশি। যেমন-

  • ভেজা কাপড় নিংড়ানো, ভারী কিছু তোলা বা রুটি বেলার মতো কাজের সময় কনুই থেকে বাহুর অংশে ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ধরনের কাজগুলোতে কনুইয়ের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
  • সারা দিন এক ভঙ্গিমায় মাউস ধরে কাজ করার সময়ও এই ব্যথা অনুভূত হতে পারে। দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে কাজ করা কনুইয়ের জন্য ক্ষতিকর।
  • হাতের কনুইয়ে ব্যথা অনুভব হলে হাত দিয়ে কোনো কিছু তুলতে সমস্যা হয়। এই ব্যথা হাতের নড়াচড়া বা কাজকর্মে আরও বেড়ে যায়।
  • এই ব্যথা কেবল কনুইতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি কনুই থেকে শুরু হয়ে হাতের আঙুল পর্যন্ত যেতে পারে, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
  • এমনকি অপরজনের সাথে করমর্দন (handshake) করার সময়ও এই ব্যথা অনুভূত হতে পারে, যা সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে।

কি করে বুঝবেন যে আপনার Tennis Elbow হয়েছে কিনা?

টেনিস এলবো বা Lateral Epicondylitis শনাক্ত করার জন্য দুটি সহজ টেস্ট আছে:

১. চাপ পরীক্ষা: কনুইয়ের বাইরের দিকের জাংশন পয়েন্টে (যেখানে কনুই শেষ হচ্ছে এবং নিম্নবাহু শুরু হচ্ছে) আলতো করে চাপ দিলে যদি প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয়, তাহলে টেনিস এলবো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

২. কব্জি তোলার টেস্ট: হাতকে L আকৃতিতে করে কব্জিটাকে উপরের দিকে তোলার চেষ্টা করলে যদি কনুইতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয় এবং কব্জিটাকে উপরে তোলা থেকে আটকায়, তাহলেও টেনিস এলবো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অন্যান্য পরীক্ষা:

  • এক্স-রে: এক্স-রে টেনিস এলবো শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে না, কিন্তু অন্যান্য সমস্যা যেমন হাড়ের ভাঙা ইত্যাদি শনাক্ত করতে পারে।
  • রক্ত পরীক্ষা: শর্করা, সিরাম ইউরিক এসিড, আরএ ফ্যাক্টর ইত্যাদি পরীক্ষা করলে টেনিস এলবোর কারণ অন্য কোনো রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, থাইরয়েড) হলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
  • আল্ট্রাসাউন্ড: কনুইয়ের বিশেষ ধরনের আল্ট্রাসাউন্ড টেনিস এলবো শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
  • এমআরআই: এমআরআই টেনিস এলবোর কারণ এবং মাংসপেশী ও টেনডন ক্ষতির বিস্তার শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

Tennis Elbow হলে কি করবেন?

টেনিস এলবোর জন্য ভালো খবর হলো এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৩-৪ মাস বা ৬ মাসের মধ্যে নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায়।

এই সময়কালে কিছু বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ:

  • বিশ্রাম: কনুইকে যথাসম্ভব বিশ্রাম দিন। মোটরবাইক চালানো, কম্পিউটারের মাউস ধরে একটানা কাজ করা এড়িয়ে চলুন। তবে অতিরিক্ত বিশ্রামের কারণে কনুই স্টিফ হতে পারে, তাই নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন।
  • বরফ/গরম সেঁক: প্রদাহ, ফোলা ও ব্যথা কমাতে বরফ বা গরম সেঁক দিতে পারেন।
  • ব্যায়াম: কনুইয়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া ও পেশি শক্তিশালী করার জন্য ব্যায়াম করা উচিত। ব্যথা ও ফোলা কমে গেলে হালকা ব্যায়াম শুরু করুন।
  • খাবার: উচ্চ প্রোটিন এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার (যেমন লেবু, আমলকি) খান।
  • ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ: যদি ৬ মাসের মধ্যে ব্যথা না কমে, তাহলে অবশ্যই একজন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

টেনিস এলবোর চিকিৎসা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কনজারভেটিভ (অস্ত্রোপচার ছাড়া) পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। তবে দুঃখের বিষয়, এই রোগ সেরে যাওয়ার কিছুদিন পর আবার দেখা দিতে পারে। অনেক সময় কনুইয়ের বাইরের দিকে ব্যথা না হয়ে যখন কনুইয়ের ভেতরের পাশে ব্যথা হয়, তাকে গলফার্স এলবো বলে, যার চিকিৎসাও টেনিস এলবোর মতোই।

সতর্কতা:

ইন্টারনেটের তথ্য অনুযায়ী নিজের বা অন্য কারো চিকিৎসা করার চেষ্টা কখনই করবেন না। এগুলো পড়বেন নিজের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার জন্য যাতে ডাক্তারকে আপনার সমস্যাটি জানাতে ও ডাক্তারের পরামর্শ সহজে বুঝতে পারেন আপনি সর্ব অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন।

No comments:

Post a Comment