November 14, 2024

মৃগীরোগের বৈজ্ঞানিক দিক: কারণ ও চিকিৎসা

মৃগীরোগ (Epilepsy) একটি স্নায়ুবিক রোগ যা সাধারণত মানবদেহের কার্য পরিচালনাকারী মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের উদ্দীপক (স্নায়ু কোষের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে, গ্লুটামেট,অ্যাসিটাইলকোলিন) ও নিবৃত্তিকারক (স্নায়ু কোষের কার্যকলাপ কম করে, গ্যাবা, অ্যাসিটাইলকোলিন) অংশদ্বয়ের  অস্বাভাবিকতার কারণে ঘটে। 
 রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ
মৃগীরোগের অবস্থাকে ঘিরে সামাজিক কল্পকাহিনিসহ অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেক সময় বলা হয়, এটা ভূতপ্রেত বা দুষ্ট আত্মা দ্বারা সৃষ্ট। এটা সত্য নয় এবং এর সঙ্গে অতীত জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি একটি বৈজ্ঞানিক স্নায়বিক বিষয়, যা সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
মৃগীরোগের কারণসমূহ
  1. জেনেটিক কারণ: ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মৃগীরোগ জেনেটিক প্রবণতা দ্বারা সৃষ্ট। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রথম পর্যায়ের আত্মীয়দের মধ্যে মৃগীরোগের ঝুঁকি দুই থেকে চার গুণ বেড়ে যায়।
  2. মস্তিষ্কের আঘাত: মাথার আঘাত, যেমন দুর্ঘটনার ফলে মস্তিষ্কে আঘাত।
  3. মস্তিষ্কের সংক্রমণ: যেমন মেনিনজাইটিস বা এনসেফালাইটিস।
  4. মস্তিষ্কের টিউমার: মস্তিষ্কের টিউমারও মৃগীরোগের কারণ হতে পারে।
  5. মেটাবলিক সমস্যা: যেমন হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া) বা ইলেকট্রলাইটের অস্বাভাবিকতা।
  6. ড্রাগ প্রভাব: কিছু ড্রাগ বা অ্যালকোহল ব্যবহারের ফলে মৃগীরোগের আক্রমণ হতে পারে।
  7. অপরিপক্কতার কারণে: শিশুদের মধ্যে মৃগীরোগের কিছু কারণ অপরিপক্কতা বা জন্মগত ত্রুটি হতে পারে।
মৃগীরোগ বা এপিলেপসি বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ প্রকাশ করতে পারে। এই লক্ষণগুলি সাধারণত মৃগীরোগের আক্রমণের সময় ঘটে এবং এটি রোগীর পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। নিচে মৃগীরোগের কিছু সাধারণ লক্ষণ উল্লেখ করা হলো:
মৃগীরোগের লক্ষণ
  • অচেতনতা: রোগী কিছু সময়ের জন্য অচেতন হয়ে যেতে পারে।
  • অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি: হাতে বা পায়ে শেকড় বা কাঁপুনি দেখা দিতে পারে।
  • হঠাৎ পড়ে যাওয়া: রোগী হঠাৎ করে পড়ে যেতে পারে।
  • সংবেদনশীলতা পরিবর্তন: কিছু রোগী সম্মোহনের অনুভূতি বা অন্য ধরনের অস্বস্তি অনুভব করতে পারে।
  • মাংসপেশির শক্তি কমে যাওয়া: আক্রমণের সময় মাংসপেশির শক্তি কমে যেতে পারে।
  • চেতনাবোধের পরিবর্তন: রোগী আক্রমণের সময় চেতনা হারিয়ে ফেলতে পারে বা অসংলগ্ন কথা বলতে পারে।
  • অস্বাভাবিক আচরণ: কিছু রোগী আক্রমণের সময় অস্বাভাবিক আচরণ যেমন, অযৌক্তিক কথা বলা বা অস্বাভাবিক কার্যকলাপ করতে পারে।
  • মুখে ফেনা আসা: কিছু ক্ষেত্রে রোগীর মুখে ফেনা আসতে পারে।

সতর্কতা

যদি কোনো ব্যক্তি এই লক্ষণগুলির মধ্যে একটি বা একাধিক লক্ষণ প্রদর্শন করে, তবে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃগীরোগের আক্রমণ বিভিন্ন ধরণের এবং তীব্রতা থাকতে পারে, তাই সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
মৃগীরোগের চিকিৎসা
মৃগীরোগ বা এপিলেপসি চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি এবং চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। রোগীর অবস্থা এবং আক্রমণের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারিত হয়। নিচে মৃগীরোগের চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি উল্লেখ করা হলো:
এন্টি-এপিলেপ্টিক ড্রাগস: এ ধরনের ঔষধ মৃগীরোগের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। কিছু সাধারণ ঔষধের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত: ফেনিটোইন (Dilantin), কার্বামাজেপিন (Tegretol), লামোট্রিজিন (Lamictal), ভ্যালপ্রোয়িক অ্যাসিড (Depakote)
চিকিৎসক রোগীর জন্য সঠিক ঔষধ এবং ডোজ নির্ধারণ করবেন।
সার্জারি: যদি ঔষধ দ্বারা আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে সার্জারি বিবেচনা করা হয়। এটি সাধারণত মস্তিষ্কের সেই অংশটি অপসারণ করতে হয় যা আক্রমণের জন্য দায়ী।
কেটোজেনিক ডায়েট: কিছু মৃগী রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ চর্বি এবং কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত ডায়েট আক্রমণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
নার্ভ স্টিমুলেশন: এটি মস্তিষ্কে সিগন্যাল পাঠানোর মাধ্যমে আক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।
মনোচিকিৎসা: কিছু রোগী মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের কারণে মৃগীরোগের আক্রমণ অনুভব করতে পারেন। মনোচিকিৎসা বা কাউন্সেলিং এই ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
মৃগীরোগ (এপিলেপসি) রোগীদের জন্য জীবনধারার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি রোগীর মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে। নিচে কিছু সতর্কতা ও স্বজনদের করণীয় উল্লেখ করা হলো:

মৃগীরোগের সতর্কতা

  • ঔষধ নিয়মিত গ্রহণ: রোগীরা চিকিৎসকের নির্ধারিত ঔষধ নিয়মিত গ্রহণ করবেন এবং ডোজ মিস করবেন না।
  • স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ: মানসিক চাপ কমানোর জন্য মেডিটেশন, যোগব্যায়াম বা অন্যান্য শিথিলকরণ কৌশল ব্যবহার করুন।
  • ঘুমের সঠিক ব্যবস্থা: পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন, কারণ ঘুমের অভাব মৃগীরোগের আক্রমণ বাড়াতে পারে।
  • মদ ও ধূমপান এড়িয়ে চলা: অ্যালকোহল এবং ধূমপান যেমন স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে, তেমনি এটি মৃগীরোগের আক্রমণও বাড়াতে পারে।
  • নিরাপদ পরিবেশ: বাড়ির পরিবেশটি নিরাপদ করুন যাতে আক্রমণের সময় আহত হওয়ার সম্ভাবনা কমে। যেমন: ধারালো জিনিসপত্র দূরে রাখুন। গোসল বা রান্নার সময় সঙ্গে থাকুন।
  • কারণ খুঁজে বের করুন: খিঁচুনি বা মৃগীরোগ শুরুর কারণ খুঁজে বের করুন। খুব সাধারণ কারণগুলো হলো নিয়মিত ওষুধ না খাওয়া, মানসিক চাপ, খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম, মদ্যপান, অনিদ্রা, উজ্জ্বল আলো, জোরে আওয়াজ ইত্যাদি খিঁচুনি সৃষ্টি করে।
  • গাড়ি চালানো এবং সাঁতার কাটা:  খিঁচুনি খুব ঘন ঘন হলে গাড়ি চালানো, সাঁতার কাটা এবং রান্না করা যাবে না। কারণ, এগুলো করার সময় খিঁচুনি হলে তা খুবই ক্ষতিকারক হবে।
স্বজনদের করণীয়
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবারের সদস্যদের এবং বন্ধুবান্ধবদের মৃগীরোগ সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করুন।
  • আক্রমণের সময় সাহায্য: আক্রমণের সময় রোগীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান এবং আক্রমণটি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
  • রোগীর অনুভূতি বোঝা: রোগীর মানসিক অবস্থার প্রতি মনোযোগ দিন এবং তাদের অনুভূতি ও উদ্বেগের প্রতি সহানুভূতি দেখান।
  • ডায়েরি রাখা: রোগীর আক্রমণের সময়, স্থানে এবং সময়ের একটি ডায়েরি রাখা যাতে চিকিৎসা পরিকল্পনা উন্নত করা যায়।
  • ডাক্তারী পরামর্শ: নিয়মিত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ রাখুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা পরিবর্তন বা পরামর্শ নিন।

উপসংহার

মৃগী হলো একটি পরিচালনযোগ্য অবস্থা যা চিকিৎসা এবং জীবনধারার সঠিক পদ্ধতির মাধ্যমে সচেতনতা  এবং সমর্থন প্রদান করে, আমরা এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবন উন্নত করতে পারি। সামগ্রিকভাবে, মৃগী রোগীদের সমর্থন করার ক্ষেত্রে বোঝাপড়া এবং কেয়ার মূল চাবিকাঠি।

No comments:

Post a Comment