ডা. মনসুর রহমান
মাস্কুলোস্কেলিটাল ডিসঅর্ডারস এবং রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ
অ্যাবায়োজেনেসিস (Abiogenesis) হলো বিজ্ঞানের সেই শাখা যা অনুসন্ধান করে কীভাবে নির্জীব রাসায়নিক পদার্থ থেকে পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। এটি বিবর্তনবাদ (Evolution) থেকে ভিন্ন; কারণ বিবর্তন ব্যাখ্যা করে প্রাণ সৃষ্টির পর তা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, আর অ্যাবায়োজেনেসিস ব্যাখ্যা করে প্রাণ শুরু হলো কীভাবে।
নিচে এর বৈজ্ঞানিক ধাপ ও তত্ত্বগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান
প্রাণ সৃষ্টির জন্য চারটি প্রধান জৈব অণুর প্রয়োজন ছিল:
- অ্যামিনো অ্যাসিড: যা প্রোটিন তৈরি করে।
- নিউক্লিওটাইড: যা DNA এবং RNA তৈরি করে।
- লিপিড: যা কোষের চারপাশের দেয়াল বা মেমব্রেন তৈরি করে।
- কার্বোহাইড্রেট: যা শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
মিলার-ইউরে পরীক্ষা (The Miller-Urey Experiment)
১৯৫৩ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার এবং হ্যারল্ড ইউরে যে ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি করেছিলেন, তা বিজ্ঞানের ইতিহাসে 'মিলার-ইউরে এক্সপেরিমেন্ট' নামে পরিচিত। এটি মূলত প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে—প্রাণ সৃষ্টির জন্য কোনো অলৌকিক শক্তির প্রয়োজন নেই, বরং উপযুক্ত পরিবেশে জড় পদার্থ থেকেই প্রাণের প্রাথমিক উপাদান তৈরি হওয়া সম্ভব।
নিচে এই পরীক্ষার মূল বিষয়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
আদি পৃথিবীর পরিবেশ তৈরি
বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে একটি কাঁচের যন্ত্রের ভেতর কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করেন। সেখানে তারা ব্যবহার করেছিলেন:
- গ্যাস: মিথেন (CH_4), অ্যামোনিয়া (NH_3), হাইড্রোজেন (H_2) এবং জলীয় বাষ্প (H_2O)। তখনকার বায়ুমণ্ডলে কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিল না।
- তাপ: নিচের একটি ফ্লাস্কে পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়েছিল (আদি সমুদ্রের উত্তাপ বোঝাতে)।
- বিদ্যুৎ (বজ্রপাত): দুটি ইলেকট্রোডের মাধ্যমে উচ্চ ভোল্টেজের ইলেকট্রিক স্পার্ক দেওয়া হয়েছিল, যা আদি পৃথিবীর প্রচণ্ড বজ্রপাতের বিকল্প হিসেবে কাজ করেছিল।
ধাপসমূহ: রাসায়নিক থেকে জৈবিক রূপান্তর
অ্যাবায়োজেনেসিসের প্রক্রিয়াটি সাধারণত নিচের চারটি ধাপে কল্পনা করা হয়:
ক) মনোমার গঠন (Monomers): আদি সমুদ্রের "অর্গানিক স্যুপ"-এ বজ্রপাত বা আগ্নেয়গিরির তাপে সাধারণ অণুগুলো মিলে জটিল জৈব অণু (অ্যামিনো অ্যাসিড, শর্করা) তৈরি করে।খ) পলিমার গঠন (Polymers): এই ছোট অণুগুলো একত্রিত হয়ে দীর্ঘ শৃঙ্খল বা পলিমার (যেমন প্রোটিন বা নিউক্লিক অ্যাসিড) গঠন করে। উত্তপ্ত কাদা বা মাটির পৃষ্ঠে এই বিক্রিয়াগুলো সহজতর হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।গ) প্রোটো-বায়োন্ট (Protobionts): লিপিড বা চর্বি জাতীয় অণুগুলো পানির সংস্পর্শে আসলে গোল গোল বুদবুদের মতো গঠন তৈরি করে, যাকে বলে 'ভেসিকল'। এটি বাইরের পরিবেশ থেকে ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে আলাদা রাখে, যা একটি কোষের প্রাথমিক রূপ।ঘ) জেনেটিক রেপ্লিকেশন (RNA World Hypothesis): সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বংশগতি। বর্তমানে ধারণা করা হয়, DNA-র আগে RNA ছিল প্রধান অণু। কারণ RNA তথাকথিত "স্মৃতি" বহন করতে পারে এবং নিজেই এনজাইম হিসেবে কাজ করে নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।
- গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট: সমুদ্রের তলদেশের আগ্নেয়গিরির ছিদ্রপথে খনিজ এবং তাপের প্রাচুর্য প্রাণের জন্য আদর্শ ছিল।
- কর্দমাক্ত অগভীর জলাশয়: ডারউইনের ভাষায় "Warm Little Pond", যেখানে সূর্যের আলো ও বাষ্পীভবন রাসায়নিক ঘনত্ব বাড়িয়েছিল।
- প্যানস্পারমিয়া (Panspermia): কারো মতে উল্কাপিণ্ড বা ধূমকেতুর মাধ্যমে মহাকাশ থেকে প্রাণের প্রাথমিক অণু পৃথিবীতে এসেছে।
- অ্যাবায়োজেনেসিসের প্রমাণ: এটি হাতে-কলমে দেখাল যে "প্রাণহীন" রাসায়নিক উপাদান থেকে "প্রাণের উপাদান" তৈরি হওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব।
- রাসায়নিক বিবর্তন: এই পরীক্ষাটি প্রমাণ করে যে ডারউইনের বিবর্তনবাদ (জীব থেকে জীব) শুরু হওয়ার আগে পৃথিবীতে একটি 'রাসায়নিক বিবর্তন' (অণু থেকে জীবন) ঘটেছিল।
- বায়ুমণ্ডলের উপাদান: পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে আদি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মিথেন বা অ্যামোনিয়া অতটা বেশি ছিল না যতটা মিলার ধরেছিলেন। কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন বেশি ছিল।
- জীবন্ত কোষ নয়: মিলার অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করতে পেরেছিলেন, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ "জীবন্ত কোষ" তৈরি করা আজও বিজ্ঞানের কাছে চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ, ইটের টুকরো (অ্যামিনো অ্যাসিড) তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই ইট দিয়ে ঘর (কোষ) কীভাবে তৈরি হলো—তা এখনো গবেষণাধীন।
No comments:
Post a Comment