প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষায়িত কমান্ডো বাহিনী। এটি ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তারিখে ২টি ব্যাটালিয়ান নিয়ে গঠিত হয়। এই ব্রিগেডের মূল উদ্দেশ্য হলো "বিশেষ অপারেশন সম্পাদন করা এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা"। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে বিশেষ অভিযান ইউনিটের শুরু। বেশিরভাগই জঙ্গল যুদ্ধ এবং বিদ্রোহবিরোধী ইউনিটের আকারে ১৯৭৪ সাল থেকে, কমান্ডো ইউনিটগুলি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন নামে বিদ্যমান ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি পৃথক "বিশেষ অভিযান সক্ষম ইউনিট" প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ জুন ১৯৯২ সালে প্রথম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন হিসেবে গঠিত হয়। এটি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম অত্যাআধুনিক বিশেষ বাহিনী। ইউনিটটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ১ জুন ২০১৫ সালে জাতীয় স্বীকৃতি পায়। অ্যাড হক প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে গঠিত হয় এবং ১০ অক্টোবর ২০১৯ সালে ব্রিগেডটি তার পূর্ণ কাঠামো এবং শক্তি পায়। ব্রিগেডের আনুষ্ঠানিক পতাকা প্রথম ২৮ অক্টোবর ২০২০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা উত্তোলন করা হয়।
ইতিহাস
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর একটি বিশেষায়িত নগর যুদ্ধ ইউনিট ছিল ক্র্যাক প্লাটুন। ১৯৭১ সালের জুনে, সেক্টর ২ কমান্ডার খালেদ মোশাররফ এই বিশেষায়িত নগর গেরিলাদের ঢাকা শহরে পাঠান। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত অভিযান ছিল অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। এই গেরিলারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করে, যেখানে বিশ্ব ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি এবং পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ একটি সভায় অংশগ্রহণ করছিল। এই অভিযানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দশ থেকে পনেরজন সৈন্য নিহত হয় এবং অনেকে আহত হয়।
প্লাটুনের উল্লেখযোগ্য অভিযানগুলির মধ্যে রয়েছে:
- অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল
- অপারেশন ফাইভ পাওয়ার স্টেশন
- অপারেশন ফার্ম গেট
- অপারেশন ধানমন্ডি
- অপারেশন গ্রিন রোড ইত্যাদি
যুদ্ধের সময় ক্র্যাক প্লাটুন ঢাকায় ৮২টি গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে।
স্পেশাল ওয়ারফেয়ার উইং
সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে স্কুল অফ ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিক্সে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখা ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বিশেষ বাহিনীর গঠনের এটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ। ১৯৮০ সালে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখায় সেনাবাহিনীর কমান্ডো কোর্স এবং বিদ্রোহ দমন কোর্স শুরু হয়। একই বছরে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখা বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা স্কুলে পরিণত হয়। ১৯৮৮ সালে সিলেট ক্যান্টনমেন্টে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা শাখার অধীনে সেনাবাহিনীর এয়ারবোর্ন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৯ সালে বিশেষ যুদ্ধবিদ্যা স্কুলে প্রথমবারের মতো প্যারা প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হয়।
১ম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন
সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে ১৯৯২ সালের ৩০ জুন ১ম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৩ সালের মে মাসে ব্যাটালিয়নের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২০০৫ সালের ১ জুন ১ম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন পূর্ণাঙ্গ রেজিমেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে অ্যাড হক প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড গঠনের পর থেকে তারা ব্রিগেডের অধীনে কাজ শুরু করে। তাদের অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭ সালের ২ নভেম্বর ব্যাটালিয়নকে জাতীয় পদমর্যাদা প্রদান করা হয়।
২য় প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন
২০১৬ সালে পারা কমান্ডো ব্রিগেডের সদর দপ্তরের সাথে সাথে অস্থায়ী ভিত্তিতে দ্বিতীয় পারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়। অবশেষে ২০১৯ সালে এটি দ্বিতীয় পারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন হিসেবে গঠিত হয়। ব্যাটালিয়নের আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানটি ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর সিলেট ক্যান্টনমেন্টে অনুষ্ঠিত হয়।
অপারেশন
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা
১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করছে। বর্তমানে, বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানের অন্যতম বৃহত্তম অবদানকারী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইভরি কোস্ট, দক্ষিণ সুদান, ডারফুর, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, হাইতি এবং মালিতে বিভিন্ন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রয়োগ মিশনে তার বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করেছে। BANSF প্রিফিক্স ব্যবহার করে এই বিশেষ বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত বেক্তিরা প্রায়শই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান এবং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলা করার দায়িত্ব পায়।
অপারেশন থান্ডারবোল্ট
ঢাকার গুলশান ২-এর হোলি আর্টিসান বেকারিতে ঘটে যাওয়া হামলাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ ঘটনা। ২০১৬ সালের ১ জুলাই পাঁচজন আক্রমণকারী বেকারিতে বোমা, ছুরি, একে-২২ রাইফেল এবং পিস্তল নিয়ে হামলা চালায়। রাত ৯:২০ টার দিকে তারা বেকারিতে থাকা স্থানীয় ও বিদেশীদের বন্দী করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে না পেরে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রথমে বেকারিটি নিরাপদ করার চেষ্টা করে, যার ফলে আক্রমণকারীদের সাথে গুলিবর্ষণের সময় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়। তবে, পুলিশ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন দ্রুত বেকারির চারপাশে ঘেরাও তৈরি করে যাতে কোন আক্রমণকারী পালিয়ে যেতে না পারে।ঘন্টার পর ঘন্টা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করেও যখন অপরাধীরা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
২ জুলাই শনিবার ভোরের দিকে এক উচ্চ পর্যায়ের সরকারি বৈঠকে ১ম কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বন্দীদের মুক্ত করার জন্য ১ম কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে সিলেট থেকে ঢাকায় আনা হয়। অপারেশনটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৬তম স্বাধীন পদাতিক ব্রিগেডের অপারেশনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১ম প্যারা-কমান্ডো ব্যাটালিয়নের দ্বারা পরিচালিত হয়। র্যাব এবং পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কমান্ডোরা তাদের অভিযান (কোডনাম "অপারেশন থান্ডারবোল্ট") শুরু করে, যা সকাল ৭:৪০ টায় শুরু হয় এবং ৮:৩০ টায় শেষ হয়। তারা ১৩ জন বন্দীকে মুক্ত করতে এবং আক্রমণকারীদের হত্যা করতে সক্ষম হয়। এই হামলার সময় ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ২ জন বাংলাদেশী, ১ জন ভারতীয় এবং ১ জন আমেরিকানকে অপরাধীরা হত্যা করে।
সিলেটে অপারেশন টোয়াইলাইট

২০১৭ সালের ২৩শে মার্চ, বৃহস্পতিবার, বাংলাদেশ পুলিশ সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় একটি সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ঘিরে ফেলে। পরে ঢাকা থেকে একটি সোয়াট দল পুলিশ ইউনিটে যোগ দেয় এবং শুক্রবার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের কর্মী এদের সঙ্গে যুক্ত হয়। শনিবার, প্রথম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন অপারেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এটিকে অপারেশন টুইলাইট নামকরণ করে।জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টের ১৭তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনোয়ারুল মোমেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাড হক প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডের প্রথম প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন দ্বারা অপারেশন টুইলাইট শুরু করা হয়। ভবনের প্রধান ফটকটি জঙ্গিরা একটি রেফ্রিজারেটর দিয়ে বন্ধ করে দেয় যার সাথে একটি আইইডি সংযুক্ত ছিল। ভবনে ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট এবং ১৫০টি কক্ষ ছিল, জঙ্গিরা ক্রমাগত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছিল। অপারেশন শনিবার সকাল ৮ টার দিকে শুরু হয়। কমান্ডো ইউনিটকে সোয়াট এবং বাংলাদেশ পুলিশ সহায়তা করে। সুরক্ষা বাহিনী জঙ্গি আস্তানার চারপাশে তিন কিলোমিটার পরিসীমা স্থাপন করে। কমান্ডোরা বৃহস্পতিবার থেকে ভবনে আটকা পড়া ৭৮ জন বেসামরিক নাগরিককে উদ্ধার করে। প্রাথমিক আক্রমণে দুই জঙ্গি নিহত হয়। জঙ্গিরা ভবনের সর্বত্র আইইডি স্থাপন করেছিল যা সামরিক অভিযানকে ধীর করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জঙ্গিদের বের করে আনার জন্য আরপিজি এবং গোলা ব্যবহার করেছিল যা খুব বেশি সফল হয়নি। কমান্ডোরা অভিযানে বর্মিত যানবাহনও ব্যবহার করেছিল। অবশেষে আস্তানায় চার জঙ্গির মৃতদেহ পাওয়া যায়।
অপারেশন BEKPA-2
বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্স (BANSF/3) যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিরক্ষা মিশনে কেন্দ্রীয় আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহণ করে। BANSF-3 এর মেজর মোঃ শাহিদুল ইসলাম বিদ্রোহী গোষ্ঠী Unity for peace in the Central African Republic (UPC) থেকে একটি এলাকা মুক্ত করার জন্য অভিযানের নেতৃত্ব দেন। একই সময়ে, অভিযানের মাধ্যমে ১০০ জনেরও বেশি বন্দীকে উদ্ধার করা হয়।
অপারেশন POUPOU
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে মিনুস্কা অভিযানে বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্সের (BANSFC/3) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম আজাদ, SUP, নেতৃত্ব দেন। তিনি সেই সময়ে BANSFC/3 এর কনটিনজেন্ট কমান্ডার ছিলেন।২০১৯ সাল এফডিপিসি সশস্ত্র গোষ্ঠী জুকুম্বো গ্রামে সকল ধরণের যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। গ্রামে ২০০-৩০০টি ঘর ছিল এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০। ৩ এপ্রিল BANSFC/3 এবং BANBAT/5 কে অভিযানের জন্য নিযুক্ত করা হয়। ৫ এপ্রিল: BANBAT/5 গ্রামে অবরোধ তৈরি করে এবং BANSFC/3 অভিযান শুরু করে। BANSFC/3 সদস্যরা গ্রামে প্রবেশ করে এবং ঘর থেকে ঘরে অভিযান চালিয়ে পুরো এলাকা পরিষ্কার করে। তারা ১১টি সরকারি পিকআপ এবং ৭০ জন বেসামরিক নাগরিককে উদ্ধার করে এবং FACA প্লাটুনের কাছে হস্তান্তর করে । এই অভিযানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫ জন সদস্য নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়। শান্তিরক্ষা বাহিনীর কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে কিছু সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ময়ূরপঙ্খী অভিযান
২০১৯ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারী, ঢাকা থেকে দুবাই যাওয়ার পথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানকে পলাশ নামে একজন অস্ত্রধারী অপহরণের চেষ্টা করে। বিমানটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। যদিও তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল না, কর্তৃপক্ষ তার সাথে আলোচনা করার চেষ্টা করে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে, প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডকে হামলা শুরু করার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে কমান্ডোদের মাত্র আট মিনিট সময় লেগেছিল। ফলে, অপহরণকারীকে কমান্ডোরা গুলি করে হত্যা করে, ১৪৮ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পায়