আপনার চারপাশে যা কিছু আছে আপনি, আমি, আকাশের তারা, সূর্য, চাঁদ, গ্রহ, ধূলিকণ এমনকি যেগুলো আমরা এখনো আবিষ্কার করিনি সবকিছুই একটি বিশাল সত্তার অংশ। এই সত্তার নামই মহাবিশ্ব।
🌌 মহাবিশ্ব মানে কী?
মহাবিশ্ব বা Universe কেবল নক্ষত্রের সমাহার নয়, বরং সময়, স্থান, পদার্থ, শক্তি, মহাকর্ষ, আলো, অন্ধকার—সবকিছুর এক অভূতপূর্ব সমন্বয়। এমনকি যেটাকে আমরা “শূন্যতা” বলে ভাবি, সেটাও মহাবিশ্বেরই অংশ। আপনার শরীরের প্রতিটি পরমাণু চুল, হাড়, রক্ত, মস্তিষ্ক—এসব তৈরি হয়েছে হাইড্রোজেন, কার্বন, অক্সিজেন, লোহা, ক্যালসিয়ামসহ নানা মৌলের সংমিশ্রণে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আজ যে মৌলগুলো আমাদের শরীর, পৃথিবী বা জীবনের উপাদান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ একসময় এরা ছিলই না। এই সকল মৌলের জন্ম হয়েছে এক মহাজাগতিক কারখানায় বহু আলোছায়ার গভীরে, বিশাল বিশাল নক্ষত্রের অভ্যন্তরে।
এই নক্ষত্রগুলো, যারা কোটি বছর ধরে আলো জ্বালিয়েছে, একসময় পৌঁছায় তাদের জীবনচক্রের শেষ প্রান্তে। আর ঠিক তখনই ঘটে এক ভয়াবহ ও বিস্ময়কর ঘটনা সুপারনোভা!
একটি নক্ষত্র যখন সুপারনোভা বিস্ফোরণে বিস্মৃত হয়, তখন তার অন্তর্গত ভারী মৌলগুলো ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশে। এই বিস্ফোরণ থেকেই সৃষ্টি হয় লোহা, সোনা, ক্যালসিয়াম কিংবা অক্সিজেনের মতো মৌল যেগুলোর সমন্বয়ে তৈরি হয় গ্রহ, চাঁদ, জল আর জীবন।
অর্থাৎ, আপনি,আমি,আমাদের প্রতিটি কণা কোনো এক সময় ছিল কোনো এক তারার গভীরে! হয়তো সেই তারা আজ আর নেই, তবুও তার মৃত্যুই আমাদের অস্তিত্বের পেছনে মূল কারণ।
আমরা সবাই নক্ষত্রধূলি (Star Dust)! গাছ, পাথর, নদী, রক্ত সবই সেই মহাজাগতিক চক্রের উত্তরাধিকার।আমরা সবাই একই মহাবিশ্বের সন্তান। একই প্রাচীন বিস্ময়ের ছায়ায় গঠিত।
এখন প্রশ্ন আসে—এই বিশাল মহাবিশ্বের শুরুটা কেমন ছিল?
বিজ্ঞানীরা বলেন, এই মহাবিশ্বের জন্ম হয় প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, এক রহস্যময় মুহূর্তে যাকে আমরা বলি: বিগ ব্যাং (Big Bang)। তখন ছিল না কিছুই—না সময়,না স্থান,না আলো,না কোনো কণিকা।
ছিল শুধু একটি সূচনাবিন্দু—এক অদৃশ্য বিন্দু, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন Singularity। এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের সব নিয়ম থেমে যায়। কোথাও, কিছুরও অস্তিত্ব নেই তবু সেখানেই লুকিয়ে ছিল সবকিছুর সম্ভাবনা।
হঠাৎ করেই ঘটে সেই মহান মুহূর্ত যেখান থেকে শুরু হয় স্থান, সময়, শক্তি এবং ভরের বিস্তার। অনেকেই ভাবেন, 'বিগ ব্যাং' মানে কোনো বিশাল বিস্ফোরণ কিন্তু তা নয়। এটি ছিল এক অচিন্তনীয় প্রসারণ, এক মহামুহূর্ত, যেখান থেকে জন্ম নেয়—এই অসীম মহাবিশ্ব।
Big Bang কীভাবে কাজ করে?
Big Bang মানে কেবল কোনো জায়গায় হঠাৎ একটা বিস্ফোরণ নয়। এটা ছিল একটি সার্বজনীন প্রসারণ যেখানে পুরো মহাবিশ্ব নিজেই প্রসারিত হতে শুরু করেছিল।
ভাবুন তো—না কোনো আগুন, না কোনো শব্দ! শুধু আলো, শক্তি আর স্থান মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল আর সেই সাথেই শুরু হলো সময়ের যাত্রা!
বিজ্ঞানীরা বলেন, Big Bang-এর পর মহাবিশ্ব থেমে থাকেনি। বরং আজও এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে।প্রতিটি গ্যালাক্সি দূরে সরে যাচ্ছে অন্য গ্যালাক্সি থেকে। এই সত্য প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী Edwin Hubble।
তার পর্যবেক্ষণে দেখা যায় —যত দূরে কোনো গ্যালাক্সি, তা তত দ্রুত সরে যাচ্ছে। এই ঘটনাকে বলে Redshift — যার মাধ্যমে বোঝা যায় মহাবিশ্ব এখনো প্রসারিত হচ্ছে। সেই এক মহামুহূর্তে যা শুরু হয়েছিল,আজও চলছে তার প্রতিধ্বনি…
আকাশের প্রতিটি তারা, প্রতিটি গ্যালাক্সি, এমনকি আমরাও সেই বিস্ময়কর সূচনার ধারাবাহিকতা। Big Bang ছিল সূচনা। আর আমরা এখনো সেই গল্পের মধ্যেই আছি।
আমাদের গ্যালাক্সি ও বিশাল মহাবিশ্ব
আমরা যে গ্যালাক্সিতে বাস করি, তার নাম Milky Way। এখানে আছে প্রায় ১০০ বিলিয়নের বেশি তারা।কিন্তু এমন গ্যালাক্সির সংখ্যা কত?
বিজ্ঞানীরা বলেন, মহাবিশ্বে আছে প্রায় ২ ট্রিলিয়নের মতো গ্যালাক্সি! আর প্রতিটি গ্যালাক্সিতে আছে কোটি কোটি তারা ও গ্রহ। তাহলে কল্পনা করুন— মহাবিশ্ব কতটা বিশাল!
Hubble Space Telescope – এক নতুন দৃষ্টি
১৯৯০ সালে, পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয় এক যুগান্তকারী যন্ত্র —Hubble Space Telescope। এটির নামকরণ করা হয়েছিল Edwin Hubble-এর নাম অনুসারে। এই টেলিস্কোপ ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরেই, ফলে কোনো আলো বা ধূলার প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এটি দেখতে পেরেছে মহাবিশ্বকে অবিশ্বাস্য স্পষ্টতায়। হাবলের চোখ দিয়ে আমরা দেখেছি কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি, তারার জন্ম আর মৃত্যু, গ্যাসীয় নেবুলা, এমনকি ব্ল্যাক হোলের চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্যাসও!
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? আমরা যে তারা বা গ্যালাক্সিকে দেখি, তা আসলে বর্তমানের চেহারা নয়। আমরা যা দেখি তা হলো অতীতের আলো! যদি কোনো গ্যালাক্সি হয় ১০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে, তাহলে আমরা আসলে দেখছি তার ১০০ কোটি বছর আগের অবস্থা। এ যেন এক টাইম মেশিন যার চোখে আমরা দেখি মহাবিশ্বের অতীতকে।
মহাবিশ্ব এখনো রহস্যময়
Hubble আমাদের শিখিয়েছে— মহাবিশ্ব শুধু বিশাল নয়,এটি হলো সময় ও স্থানের এক অপার সমুদ্র, যেখানে প্রতিটি তারা যেন একটি প্রশ্ন,আর প্রতিটি আলো এক টুকরো ইতিহাস। আমরা যত জানি,তার চেয়েও অনেক বেশি অজানা রয়ে গেছে। আজও মহাবিশ্ব আমাদের সামনে রেখে যাচ্ছে এমন সব প্রশ্ন, যার উত্তর এখনও রহস্য।
🚀 আসুন জেনে নিই কিছু সবচেয়ে বড় মহাজাগতিক রহস্য:
১. ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) : আমরা যে বিশ্বকে দেখি তারাগুলো, গ্রহগুলো, গ্যাসীয় মেঘপুঞ্জ, এমনকি আমি - আপনিও সবই গঠিত Normal Matter দিয়ে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, পুরো মহাবিশ্বের মাত্র ৫% হলো এই দৃশ্যমান বস্তু! আর বাকি যা কিছু আছে, তার মধ্যে প্রায় ২৭%-এর অস্তিত্ব আমরা শুধু "অনুভব" করতে পারি, কিন্তু দেখতে পাই না, ধরতেও পারি না। এই রহস্যময় পদার্থকেই বলা হয় ডার্ক ম্যাটার।
উদাহরণ হিসেবে ধরুন কোনো গ্যালাক্সি।
যখন এটি ঘূর্ণায়মান হয়, তখন তার তারাগুলোর গতি দেখে বোঝা যায় শুধু দৃশ্যমান ভর দিয়ে এই গতি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এখানেই আসে প্রশ্ন? তাহলে কী এমন আছে, যা অদৃশ্য থেকেও এই বিশাল গ্যালাক্সিকে আকর্ষণে ধরে রেখেছে?
বিজ্ঞানীরা বলেন—গ্যালাক্সির চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে এক অদৃশ্য কণার দল। এরা কোনো আলো শোষণ করে না, প্রতিফলনও করে না। তাই চোখে দেখা যায় না। কিন্তু… তাদের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।
তারার গতি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেন—সেগুলোর গতি এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, যা দৃশ্যমান বস্তুর মহাকর্ষ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। গ্যালাক্সির ঘূর্ণন, মহাবিশ্বের গঠন এবং বড় আকারের স্ট্রাকচারের আচরণ সব কিছুতেই এর ছাপ স্পষ্ট। এরা যেন এক ছায়ামান সেনাবাহিনী নিজেরা অদৃশ্য, কিন্তু গোটা মহাবিশ্বের কাঠামোকে দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। এদেরই বলা হয় ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য পদার্থ।
এরা মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ৮৫% এর প্রতিনিধিত্ব করে! তবুও, আজও এই রহস্য উন্মোচন হয়নি ডার্ক ম্যাটার আসলে কী দিয়ে গঠিত?
২. ডার্ক এনার্জি (Dark Energy): জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৯৯৮ সাল একটি যুগান্তকারী বছর । সে বছর একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী গবেষণা করছিলেন সুদূর গ্যালাক্সিতে ঘটে যাওয়া সুপারনোভার আলো নিয়ে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এই বিস্ফোরণের আলো বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ হার নির্ধারণ করা।
কিন্তু তারা যা আবিষ্কার করলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। সুপারনোভার আলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, যেসব গ্যালাক্সি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তারা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দ্রুত সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব শুধু সম্প্রসারিতই হচ্ছে না তার সম্প্রসারণের গতি বাড়ছে!
বিজ্ঞানীরা এই অজানা শক্তির নাম দেন ডার্ক এনার্জি। এটি এমন এক শক্তি,যা মহাবিশ্বের প্রায় ৬৮% অংশ জুড়ে রয়েছে। ভাবুন! আমাদের চারপাশে যে সব তারা, গ্যালাক্সি বা বস্তু দেখি,তা মিলিয়ে হয় মাত্র ৫% । আর ডার্ক এনার্জি একাই পুরো মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে — কিন্তু আমরা জানিই না এটা কী! এই শক্তি মহাকর্ষকে যেন উল্টে দেয়, সব কিছুকে দূরে ঠেলে মহাবিশ্বকে দিন দিন বড় করে তোলে।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—
ডার্ক এনার্জি কী? এটা কোথা থেকে আসে? আর শেষ পর্যন্ত এটি আমাদের মহাবিশ্বকে কোথায় নিয়ে যাবে?
কেউ বলে—এটা শূন্যস্থান বা vacuum-এর শক্তি। আবার কেউ বলে—এটা কোনো অজানা কণার প্রভাব। কিন্তু এখনো, ডার্ক এনার্জি হলো বিজ্ঞানের সবচেয়ে অজানা ও রহস্যময় শক্তি।
৩. কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole) : এই মহাবিশ্বে এমন কিছু স্থান আছে, যেখানে পদার্থ, আলো, এমনকি সময়ও বন্দি হয়ে পড়ে। এখানে প্রবেশ করলে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। এটাই কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ও রহস্যময় সত্তা।
কি এই কৃষ্ণগহ্বর?
কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole) হচ্ছে এমন একটি মহাকর্ষীয় অঞ্চল, যেখানে মহাকর্ষ বল এতটাই প্রবল যে, কোনো কিছু—এমনকি আলোও—এর হাত থেকে রেহাই পায় না।
কীভাবে তৈরি হয়?
একটি বিশাল তারার জীবন শেষ হলে, তার ভিতরের নিউক্লিয়ার জ্বালানী ফুরিয়ে যায়। তখন তার নিজের ভরের চাপে সেই তারা ভেঙে পড়ে নিজেই নিজের মধ্যে। এই চরম সংকোচন থেকেই জন্ম হয় এক কৃষ্ণগহ্বরের। এটি এমন এক বিন্দুতে পরিণত হয়—যার ঘনত্ব অসীম, এবং যাকে বলে সিঙ্গুলারিটি (Singularity)।
কৃষ্ণগহ্বরের একটি সীমা রয়েছে—ইভেন্ট হরাইজন। এটি এমন এক সীমানা, যেখান থেকে একবার কিছু প্রবেশ করলে, আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। এমনকি আলোক রশ্মিও না।
একে অনেকেই বলেন — "The point of no return"
২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো একটি কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তুলতে সক্ষম হন। এটি ছিল M87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল। যার ভর সূর্যের চেয়ে ৬.৫ বিলিয়ন গুণ বেশি। ছবিটি তোলা হয়েছিল Event Horizon Telescope নামক এক বিশাল বৈশ্বিক প্রকল্পের মাধ্যমে।
🕳️ কৃষ্ণগহ্বরের ধরণ:
1. স্টেলার ব্ল্যাক হোল: একটি মৃত তারা থেকে তৈরি হয়।
2. সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল: গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে, কোটি কোটি সূর্যের ভরের সমান।
3. মাইক্রো বা প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাক হোল: তত্ত্বীয় ধারণা—মহাবিশ্বের শুরুর দিকে সৃষ্টি হতে পারে।
🔮 রহস্য ও সম্ভাবনা
- কি আছে সিঙ্গুলারিটির ভেতরে?
- কৃষ্ণগহ্বর কি সময় ভ্রমণের দরজা খুলে দিতে পারে?
- কৃষ্ণগহ্বর কি অন্য মহাবিশ্বে যাওয়ার পথ?
এই সব প্রশ্ন আজও উত্তরহীন...কৃষ্ণগহ্বর আমাদের শেখায়—মহাবিশ্ব শুধু বিস্তৃত নয়, গভীরও। আর সেই গভীরে লুকিয়ে আছে এমন সব রহস্য, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি… এখনও।
৪. Wormhole ও Time Travel: ধরুন, আপনি ঢুকলেন একটা দরজা দিয়ে আর বের হলেন কোটি আলোকবর্ষ দূরে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। বা… ফিরে গেলেন অতীতে, কিংবা এগিয়ে গেলেন ভবিষ্যতে।বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটা অসম্ভব নয় যদি থাকে এক রহস্যময় পথ যার নাম Wormhole।
🌌 Wormhole কী?
Wormhole বা "কৃমিগহ্বর" হচ্ছে তত্ত্বীয় এক ধরনের মহাকাশীয় টানেল, যা স্থান ও সময়কে বাঁকিয়ে দুটি দূরবর্তী বিন্দুকে সংযুক্ত করতে পারে। এ ধারণা এসেছে আলবার্ট আইনস্টাইনের General Relativity থেকে। একে অনেক সময় বলা হয় — "Einstein-Rosen Bridge"।
🚀 কীভাবে কাজ করে?
তত্ত্ব অনুযায়ী, যদি আমরা একটি wormhole-এর এক প্রান্তে প্রবেশ করি, তাহলে আমরা অন্য প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারি আলোর গতির চেয়েও কম সময়ে। এভাবে সময়েরও ভিন্ন মাত্রায় প্রবেশ সম্ভব অর্থাৎ, Time Travel!
ভবিষ্যৎ বা অতীত — দুই দিকেই যাওয়া নাকি সম্ভব হতে পারে! তবে সাবধান! এই সবই এখনো তাত্ত্বিক।বাস্তবে wormhole আমরা কখনো দেখিনি,আর এমন টানেল স্থিতিশীল রাখাও বিশাল চ্যালেঞ্জ।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, হয়তো এর জন্য দরকার হবে এক বিশেষ ধরনের পদার্থ — Negative Energy বা Exotic Matter — যা এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়।
🧠 তবুও, কেন গুরুত্ব দেই?
এই তত্ত্বগুলো আমাদের জানার কৌতূহল বাড়ায়। মহাবিশ্বের কাঠামো, সময়, বাস্তবতা সব কিছুকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। মহাবিশ্বের এই রহস্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা এখনও জানি খুবই সামান্য। তবুও, প্রতিদিন বিজ্ঞান এগিয়ে চলেছে। হয়তো একদিন, আমরা সত্যিই সময় ভ্রমণ করবো...হয়তো খুঁজে পাবো একাধিক মহাবিশ্ব তথা Multiverse!
🌌 এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা?
একটি প্রশ্ন, যা হাজার বছর ধরে মানুষকে ভাবিয়ে আসছে এত বিশাল এই মহাবিশ্বে শুধু আমরাই কি একমাত্র প্রাণ?
চলুন দেখি বাস্তবতা কেমন—
আমরা যে গ্যালাক্সিতে বাস করি, মিল্কিওয়ে, সেখানে আছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন তারা। আর গোটা মহাবিশ্বে রয়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি! প্রতিটি গ্যালাক্সিতে — কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহ, আর অজস্র মহাজাগতিক বস্তু।
🧭 তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়—এই অসীম মহাবিশ্বে, কেন শুধুই এই ছোট্ট নীল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে?
🔍 বিজ্ঞান কী বলছে?
আজকের বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন —"Extraterrestrial Life" — অর্থাৎ, পৃথিবীর বাইরের প্রাণ। তবে তা হলিউডের সিনেমার মতো সবুজ রোবট বা ভয়ংকর এলিয়েন না-ও হতে পারে। প্রাণের সংজ্ঞা হতে পারে একক কোনো জীবাণু, এক ফোঁটা কোষ, অথবা শুধুই প্রাণের রাসায়নিক উপাদান
🧪 বিজ্ঞানীরা যা খুঁজছেন:
✅ পানি (Liquid Water)
✅ জৈব উপাদান (Organic Molecules)
✅ প্রাণের উপযোগী পরিবেশ
✅ অতীত বা বর্তমান প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন
🚀 কোথায় কোথায় খোঁজ চলছে?
১. মঙ্গল গ্রহ (Mars) : মঙ্গল গ্রহে একসময় প্রবাহিত হয়েছিল নদী, ছিল হ্রদ, এমনকি ছিল সমুদ্রের চিহ্ন! NASA-এর রোভার Perseverance এখনো খুঁজে চলেছে প্রাণের চিহ্ন—মাটির গভীরে, পাথরে, বাতাসে।
২. ইউরো (Europa): জুপিটারের বরফে মোড়া এই চাঁদের নিচে রয়েছে এক বিশাল উষ্ণ জলাধার! বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, এই জলে হয়তো আছে জীবাণু, কিংবা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎস।যেমন হাইড্রোথার্মাল ভেন্টস, যা পৃথিবীর গভীর সমুদ্রেও প্রাণকে টিকিয়ে রাখে।
৩. এনসেলাডাস (Enceladus): এটি শনির একটি ছোট চাঁদ, যার বরফের নিচ থেকে বের হয় জলের ফোয়ারা গেসিয়ার! NASA-এর Cassini মহাকাশযান সেই ফোয়ারা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে, যাতে পাওয়া গিয়েছিল —জীবনের জন্য দরকারি সব উপাদান!
তবে এখনো পর্যন্ত...আমরা কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাইনি যে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আমরা জানি, আমরা খোঁজা থামাবো না। কারণ SETI (Search for Extraterrestrial Intelligence) এবং বিভিন্ন রেডিও টেলিস্কোপ প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব থেকে সংকেত অনুসন্ধান করছে।
এই মহাবিশ্ব বিশাল, এবং সম্ভাবনা অসীম। হয়তো কোথাও, কোনো এক দূর গ্যালাক্সির গ্রহে, কেউ ঠিক আমাদের মতোই তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে আমরাও কি একা? এই প্রশ্ন নিয়ে।
ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এমন একটি দিন দেখব যখন দূর মহাবিশ্ব থেকে আসা কোনো সংকেত পৃথিবীর নীরবতা ভেঙে দেবে। আর আমরা বলব না, আমরা একা নই।
এই বিশাল মহাবিশ্বে,আমাদের পৃথিবী যেন কেবল একটি ধূলিকণা একটি ক্ষুদ্র নীল বিন্দু যেখানে জন্ম হয়েছে জীবন, ভাষা, আবেগ, সংস্কৃতি, ভালোবাসা। এখানেই জন্ম নিয়েছে কবিতা, বিজ্ঞান, মানবতা। এই ক্ষুদ্র গ্রহে বসেই আমরা তাকিয়ে আছি সেই অসীম মহাশূন্যের দিকে।
মহাবিশ্ব আমাদের শেখায়—কতটা ক্ষুদ্র আমরা, কতটা বিস্ময়কর আমাদের চারপাশ, আর কত কিছু জানার বাকি!
আমরা যত জানছি, বুঝছি —ততই অনুভব করছি আসল রহস্য এখনও অজানায়।




