সেরিব্রাল পালসি (Cerebral Palsy) হলো একটি নিউরোলজিক্যাল অবস্থান যা সাধারণত শিশুর জন্মের সময় বা জন্মের পরে মস্তিষ্কের আঘাতের কারণে ঘটে। এটি শিশুদের মোটর দক্ষতা, শারীরিক ক্রিয়াকলাপ এবং পেশির নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করে। সেরিব্রাল পালসি রোগের কারণে শিশুদের চলাফেরা, কথা বলা এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনে সমস্যা হতে পারে।
1. স্পাস্টিক সেরিব্রাল পালসি (Spastic Cerebral Palsy): এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকার। এর মধ্যে পেশীগুলি কঠোর হয়ে যায় এবং চলাচলে অসুবিধা হয়। এটি আবার বিভিন্ন উপ-প্রকারে বিভক্ত:
- স্পাস্টিক ডিপ্লেজিয়া (Spastic Diplegia): সাধারণত দুই পায়ে প্রভাব পড়ে।
- স্পাস্টিক হেমিপ্লেজিয়া (Spastic Hemiplegia): একপাশের শরীর প্রভাবিত হয়।
- স্পাস্টিক কড্রিপ্লেজিয়া (Spastic Quadriplegia): পুরো শরীর প্রভাবিত হয়।
2. অ্যাট্যাকটিক সেরিব্রাল পালসি (Ataxic Cerebral Palsy): এই ধরনের সেরিব্রাল পালসি সমন্বয় এবং ভারসাম্যহীনতায় সমস্যার সৃষ্টি করে। এটি চলাফেরায় অস্থিরতা এবং অসুস্থতা ঘটায়।
3. অ্যাথেটোইড সেরিব্রাল পালসি (Athetoid Cerebral Palsy): এই প্রকারের রোগীরা অস্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলন করে। সাধারণত শরীরের পেশীগুলি ছড়িয়ে পড়ে এবং সংকুচিত হয়।
4. মিক্সড সেরিব্রাল পালসি (Mixed Cerebral Palsy): এই ধরনের সেরিব্রাল পালসির মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, একজন শিশুর স্পাস্টিক এবং অ্যাথেটোইড উভয় সমস্যাই থাকতে পারে।
সেরিব্রাল পালসির বয়স ভিত্তিক উপসর্গগুলি বিভিন্ন স্তরে প্রকাশ পায়, এবং এগুলি শিশুর বয়সের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারণত, নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি বিভিন্ন বয়সে লক্ষ্য করা যায়:
১. নবজাতক (০-২ মাস)
- স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া না থাকা।
- কিছু ক্ষেত্রে পেশী অত্যধিক নরম বা কঠোর হতে পারে।
- অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গতিশীলতার অভাব।
২. শিশু (২-১২ মাস)
- বসতে, দাঁড়াতে বা হাঁটতে অক্ষমতা।
- একটি হাতের বা পায়ের ব্যবহার কম।
- সমন্বয় ও ভারসাম্যে সমস্যা (যেমন, বসার সময় পড়ে যাওয়া)।
৩. বাচ্চা (১-৩ বছর)
- চলাফেরায় অস্বাভাবিকতা: যেমন, লাফানো, দৌড়ানোতে সমস্যা।
- স্পষ্ট কথা বলতে অক্ষমতা বা কথা বলা জটিলতা।
- সামাজিক ও মানসিক বিকাশে বিলম্ব।
৪. প্রাক-বাল্যকাল (৩-৬ বছর)
- চলাফেরায় আরও অসুবিধা: হাঁটার সময় গতি কম বা অদ্ভুতভাবে হাঁটা।
- সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতার অভাব: যেমন, খেলনা জোড়া বা লেখার সময় সমস্যা।
- আচরণগত বা আবেগজনিত সমস্যা (যেমন, হতাশা বা উদ্বেগ)।
৫. বাল্যকাল (৬-১২ বছর)
- শরীরের কিছু অংশের শক্তি বা পেশী নিয়ন্ত্রণের অভাব।
- শারীরিক কার্যকলাপ এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণে সমস্যা।
- আরও কিছু সামাজিক বা শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
৬. কিশোরকাল (১২+ বছর)
- অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কঠোরতা বা দুর্বলতা বৃদ্ধি।
- উন্নত শারীরিক ও সামাজিক দক্ষতার অভাব।
- স্বনির্ভরতা অর্জনে সমস্যা।
প্রতি শিশুর ক্ষেত্রে উপসর্গগুলি ভিন্ন হতে পারে এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা এবং থেরাপির মাধ্যমে এই শিশুদের জীবনযাত্রার গুণমান উন্নত করা সম্ভব।
1. চিকিৎসকের পরামর্শ: প্রথমে একজন পেডিয়াট্রিশিয়ান বা নিউরোলজিস্টের কাছে যাওয়া হয়। তারা শিশুর ইতিহাস ও লক্ষণগুলি মূল্যায়ন করেন।
সেরিব্রাল পালসির প্রধান প্রকারভেদ:
নির্ণয় পদ্ধতি:
3.ইমেজিং: MRI বা CT স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কের চিত্র তুলে দেখা হয় যে কোনো আঘাত বা বিকৃতি আছে কিনা।
4. অন্য পরীক্ষাসমূহ: কিছু ক্ষেত্রে EEG (ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি) বা অন্যান্য পরীক্ষাও করা হতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি:
- ফিজিওথেরাপি: পেশী শক্তি ও সমন্বয় বাড়ানোর জন্য ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- অকুপেশনাল থেরাপি: দৈনন্দিন কাজগুলিতে সহায়তা করার জন্য এই থেরাপি কাজে লাগে।
- স্পিচ থেরাপি: ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করতে স্পিচ থেরাপি ব্যবহার করা হয়।
- ঔষধ: পেশী টনাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে কিছু সময়ে ব্যথা বা টনাস কমানোর জন্য চিকিৎসক ঔষধ prescribe করতে পারেন।
- সার্জারি: কিছু ক্ষেত্রে, সার্জিক্যাল হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে, যেমন স্পাস্টিসিটি কমানোর জন্য।
- সহায়ক যন্ত্র: হুইলচেয়ার, হাঁটার সহায়ক যন্ত্র ইত্যাদি ব্যবহার করা হতে পারে।
- মনোসংযোগ এবং সমর্থন: পরিবার ও সমাজের সহায়তা মনোসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
No comments:
Post a Comment